কুমিল্লার গোমতী নদীর চরে আবার শুরু হয়েছে অবাধে মাটি কাটার উৎসব। কোথাও খাড়া করে কেটে ফেলা হয়েছে মাটির স্তর, কোথাও তৈরি হয়েছে গভীর গর্ত। নদীর বুকজুড়ে ক্ষতবিক্ষত চরের পরিবেশ ও নদীর অস্তিত্ব নিয়ে তৈরি করেছে নতুন শঙ্কা ।
মাটি কেটে নেওয়ায় চরের কিনারায় ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে দুটি তালগাছ। চারপাশের মাটি দ্রুত সরিয়ে নেওয়ায় যেকোনো সময় গাছ দুটি উপড়ে পড়তে পারে। এতে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য আরো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শীত মৌসুম শুরু না হতেই গোমতী নদীর বিভিন্ন চরে ফের সক্রিয় হয়েছে মাটি কাটার চক্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের আঁধারে ট্রলিতে করে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে ফসলি জমি, নদীর চর ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—প্রকাশ্যে নদীর চর কেটে নেওয়া হলেও সংশ্লিষ্টদের নজরদারি কোথায়? দীর্ঘদিন ধরে এভাবে মাটি কাটা চললেও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে এলাকাবাসীর মধ্যে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, চলতি বছরে এখনো কোনো কাজ শুরু হয়নি। কারা নদীর চর থেকে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে পাউবোর কর্মকর্তারা অবগত নন।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং প্রশাসনের লোকজনকে ম্যানেজ করে চলছে মাটি কাটার উৎসব। ট্রাকপ্রতি মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় কুমিল্লার দুই উপজেলার প্রায় ১০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। এরপর ২০২৫ সালে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের তৎপরতায় মাটি কাটার কার্যক্রম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এবার গত এক সপ্তাহে নদীর কয়েকটি স্থানে আবার মাটি কাটতে দেখা গেছে।
কুমিল্লা নগরীর সংরাইশ এলাকার শামসু মিয়ার ছেলে ইলিয়াস এই মাটি সিন্ডিকেটের প্রধান বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। তারা বলেন, আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি।
তালগাছ দুটিকে বাঁচানোর আকুতি জানিয়ে জগন্নাথপুর এলাকার কয়েক যুবক আমার দেশকে বলেন, বর্ষায় বজ্রপাত থেকে বাঁচতে তালগাছ থাকা জরুরি। কিন্তু এভাবে মাটি কাটা চলতে থাকলে গাছ দুটি নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।
গত মঙ্গলবার কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর এলাকার গোমতী নদীর চরে গিয়ে দেখা যায়, ৩০ ফুট গভীর ও ২০০ ফুট দৈর্ঘ্য-প্রস্থ করে মাটি কেটে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। ফলে আশপাশের গাছ ও ফসলি জমি নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাটি কাটার সঙ্গে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী জড়িত।
জগন্নাথপুর এলাকায় মাটি কাটার স্থান থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে ফুটবল খেলছিলেন কয়েক যুবক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, যেভাবে মাটি কাটা হচ্ছে, তাতে তালগাছ দুটি কয়েক দিনের মধ্যেই পড়ে যেতে পারে।
রাতের আঁধারে কাটা হচ্ছে মাটি
জগন্নাথপুর এলাকার বাসিন্দা মমতাজ সরদার আমার দেশকে বলেন, দিনের বেলা মাটি কাটে না। মধ্যরাতে মাটি কেটে নিয়ে যায়। কোন দিকে নিয়ে যায়, তা আমরা দেখিনি। এসব দেখার দায়িত্ব তো আমাদের নয়, প্রশাসনের।
মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা কারা, কোথায় মাটি নেওয়া হচ্ছে এবং কী কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
আদর্শ সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাশিয়াত আক্তার বলেন, মাটি কাটার কোনো অভিযোগ এখনো আমাদের কাছে আসেনি। কেউ অবৈধভাবে মাটি কেটে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাটি কাটার সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জড়িত—এ বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ শাহরিয়ার বলেন, গোমতী নদীর চরে কারা মাটি কাটছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আলী রাজীব মাহমুদ মিঠুন বলেন, কাউকে গোমতী নদীর চর থেকে মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


