সরকারি বিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ভবনে বসে মাদকের আসর

সরকারি বিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ভবনে বসে মাদকের আসর

থানার কাছেই সরকারি বিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ভবনে মাদক সেবন, বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ ও নির্মাণসামগ্রী চুরির অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড সরকারি আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ছয়তলা ভবন ঘিরে এসব অভিযোগ করেছেন নির্মাণকাজে নিয়োজিত ব্যক্তি ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় একাধিকবার তোলা হলেও নিরাপত্তা জোরদারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। এ অবস্থায় ভবনটির নিরাপত্তা এবং সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামো রক্ষার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

নির্মাণাধীন ভবনের সুপারভাইজার রনি আমার দেশকে বলেন, প্রায় তিন বছর ধরে ভবনটির নির্মাণকাজ চলছে। তার অভিযোগ, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন দল ভবনে প্রবেশ করে ইয়াবা সেবন করে। দিনের বেলায়ও শিক্ষকদের সামনে দিয়ে বহিরাগতরা সেখানে ঢুকে পড়ে। নিষেধ করেও তাদের অনেককে প্রবেশ থেকে বিরত রাখা যাচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

সাইট ফোরম্যান পায়েল বলেন, নির্মাণকাজের শুরুর দিকে স্টোররুম ভেঙে লোহা, রডসহ বিভিন্ন মালামাল চুরি করা হয়। বর্তমানে ভবনের বৈদ্যুতিক ওয়্যারিংয়ের তারও খুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় নির্মাণসামগ্রী সুরক্ষা এবং ভবনটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সলিমুল্লাহ আমার দেশকে বলেন, গত ৩০ সেপ্টেম্বর ও ১৯ অক্টোবর উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় তিনি বিষয়টি তুলে ধরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান। তার অভিযোগ, বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীরের একটি অংশ কেটে ফেলা হয়েছে। পানির কলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ও নির্মাণসামগ্রীও চুরি হয়েছে।

প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, গভীর রাতে, বিশেষ করে রাত দেড়টা থেকে দুইটার দিকে, নির্মাণাধীন ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় বহিরাগতদের জড়ো হতে দেখা যায়। এতে নৈশপ্রহরী ও কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একাধিক সভায় বিষয়টি উত্থাপনের পরও কার্যকর পদক্ষেপের অগ্রগতি স্পষ্ট নয় বলে হতাশা জানান তিনি।

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা জানা যায়নি। একইভাবে ভবনে অননুমোদিত প্রবেশ বন্ধ, সীমানাপ্রাচীর মেরামত এবং চুরির অভিযোগ তদন্তে কী অগ্রগতি হয়েছে, সে সম্পর্কেও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপপরিদর্শক মোহাম্মদ আবদুর রশিদ আমার দেশকে বলেন, হাটহাজারী কার্যালয়ের সীমিত জনবল দিয়ে সীতাকুণ্ডসহ বিস্তৃত এলাকায় দায়িত্ব পালন করতে হয়। নিজস্ব স্থানীয় কার্যালয় ও যানবাহন না থাকায় নিয়মিত নজরদারি এবং দ্রুত অভিযান পরিচালনায় সমস্যা হয়। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, সম্প্রতি সীতাকুণ্ড থানার সামনে থেকে তিনজন ইয়াবাসেবীকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১৫ দিন করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে মাদক নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত অভিযোগ যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে তার বক্তব্যে।

সীতাকুণ্ড মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবু হেনা মোস্তফা কামাল আমার দেশকে বলেন, সারা দেশের মতো সীতাকুণ্ডেও মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে বিদ্যালয়ের নতুন ভবনে কথিত মাদকসেবীদের আড্ডা ও চুরির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশি পদক্ষেপ ও তদন্তের অগ্রগতি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, উপজেলা প্রশাসন ও থানা প্রশাসনের মধ্যে কোনো দূরত্ব নেই, তারা সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছেন। বিদ্যালয়ের নতুন ভবনে মাদকসেবীদের আড্ডা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি। মাদক নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর কথাও জানান ইউএনও।

সরকারি অর্থে নির্মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো রক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্মাণাধীন ভবনে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, রাতের নিরাপত্তা জোরদার এবং চুরির ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে এ বিষয়ে প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উত্থাপিত অভিযোগের পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা প্রকাশ করা হলে বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগ নিরসনে সহায়ক হতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন