ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে এবং অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ সামাল দিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নামছে ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় বাস। কুমিল্লার বিভিন্ন ওয়ার্কশপে বর্তমানে শতাধিক যাত্রীবাহী বাস মেরামতের অপেক্ষায় রয়েছে বা কাজের শেষপর্যায়ে আছে। এসব যানবাহন সড়কে চলাচল করলে যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা সাধারণ যাত্রীদের।
ফিটনেসবিহীন এসব বাস রাস্তায় নামানো নিষিদ্ধ এবং এ ধরনের গাড়ির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, কুমিল্লা থেকে বিভিন্ন জেলা, উপজেলা শহরে যাত্রী পরিবহনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন মালিকরা অনেক পুরোনো ও অচলপ্রায় গাড়িও মেরামত করে আবার চলাচলের উপযোগী করার চেষ্টা করছেন। যে কারণে বিভিন্ন মোটর গ্যারেজ, ওয়ার্কশপে চলছে চরম ব্যস্ততা। পুরোনো ও লক্কড়-ঝক্কড় অনেক যাত্রীবাহী বাসকে ঘষামাজা, মেরামত ও রঙ করে যেন নতুন রূপ দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য একটাইÑ ঈদের আগে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে ঘরমুখো অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের জন্য বাসগুলোকে প্রস্তুত করা। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বহুদিন ধরে বন্ধ থাকা, যান্ত্রিক ত্রুটিযুক্ত বাস, মিনিবাস ও অন্যান্য যান। তবে এসব বাস ও মালিকদের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে বাস মালিক সমিতি ও বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ।
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার নোয়াপাড়া, দীঘিরপাড়, পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড ও আলেখারচর বিশ্বরোড এলাকার বিভিন্ন গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপ ঘুরে দেখা গেছে মিস্ত্রিদের কর্মচাঞ্চল্যতা। শ্রমিকরা দিন-রাত কাজ করে পুরোনো বাসগুলোকে দ্রুত মেরামত ও রঙ করার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
তবে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে এ নিয়ে শঙ্কাও রয়েছে। তাদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে যান্ত্রিক ত্রুটি ঠিকভাবে মেরামত না করে শুধু বাহ্যিকভাবে রঙ করে বাসগুলো রাস্তায় নামানো হচ্ছে। এতে ঈদে মহাসড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং যানজট আরো বেড়ে যেতে পারে।
ওয়ার্কশপ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে শতাধিক যাত্রীবাহী বাস মেরামতের অপেক্ষায় রয়েছে বা কাজের শেষপর্যায়ে আছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৬ রোজার মধ্যেই এসব বাস মালিকদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হবে, যাতে ঈদের আগে সেগুলো সড়কে নামানো যায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব যানবাহনের অনেকেরই যথাযথ ফিটনেস নেই। বাহ্যিকভাবে মেরামত করা হলেও ইঞ্জিন, ব্রেক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ নয়। ফলে যাত্রাপথে হঠাৎ ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়া, ব্রেক ফেল করা বা নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো ঘটনার ঝুঁকি থেকে যায়।
আলেখারচর বিশ্বরোড এলাকার একটি ওয়ার্কশপের শ্রমিক ও বডি মিস্ত্রি মো. শান্ত মিয়া বলেন, সময় খুবই কম। তাই দিন-রাত কাজ চলছে। চেষ্টা করছি যেন দ্রুত বাসগুলো রাস্তায় নামানো যায়। আগামী মঙ্গলবার থেকে এসব বাস সড়কে চলাচল শুরু করবে বলে মনে করছেন এই শ্রমিক।
নোয়াপাড়া ওয়ার্কশপের মিস্ত্রি আলমগীর হোসেন জানান, তিনি এশিয়া ট্রান্সপোর্টের একটি বাস মেরামতের কাজ করছেন। দুদিনের মধ্যেই গাড়িটি পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যাবে। বর্তমানে বাসটিতে রঙ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বডির বিভিন্ন অংশ মেরামত, পরিবর্তনের কাজও চলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসচালক জানান, ঈদের আগে ফিটনেসবিহীন এসব যানবাহন রাস্তায় নামার কারণেই মহাসড়কে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। হঠাৎ বিকল হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়, যা যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ায়। ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় মালিকপক্ষ প্রতিবছর ঈদের সময় লক্কড়-ঝক্কড় বাস মহাসড়কে নামায়।
এ বিষয়ে কুমিল্লা মোটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খন্দকার জামিল আহমেদ আমার দেশকে বলেন, গত সপ্তাহে বাস মালিকদের নিয়ে বৈঠক করেছি।
বৈঠকে কঠোরভাবে বলা হয়েছে, কেউ যদি পুরোনো অনুপযুক্ত বাস মহাসড়কে নামায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ঈদের সময় ভাড়া বাড়ানো যাবে না বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লা বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক ফারুক আহমেদ আমার দেশকে বলেন, লক্কড়-ঝক্কড় বাস তো বটেই, নম্বরবিহীন কোনো বাসও মহাসড়কে নামতে দেওয়া হবে না। এমন যানবাহন পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় অভিযান চালাচ্ছি।
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি ও কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশ সুপার শাহিনুর আলম বলেন, যানজট ও দুর্ঘটনার বিষয়টি মাথায় রেখেই লক্কড়-ঝক্কড় বাসের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ বাস মহাসড়কে চলাচল বন্ধ করতেই হবে।
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাশেদুল হক চৌধুরী জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বলেন, কুমিল্লার মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশ, ডিবি, র্যাব ও সাদা পোশাকে পুলিশে দায়িত্ব পালন করবে। ডাকাতি রোধে মহাসড়কসংলগ্ন থানার ওসিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

