‘ঘুসের টাকা ফেরত’ চাইতে গিয়ে থানার ভেতরেই কলেজছাত্রী ও তার মা রক্তাক্ত হয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, থানায় তাদের আটকে রেখে বেধড়ক মারধর করেন এসআই ও তার সহযোগীরা। ঘটনাটি আড়াল করতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) ডেকে এনে দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে মা-মেয়েকে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, মারধরের পরও তাদের কোনো চিকিৎসা না দিয়ে সরাসরি কারাগারে পাঠানো হয়।
গত বুধবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে কক্সবাজারের পেকুয়া থানায় চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় তুমুল আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। মারধরের শিকার ওই দুই নারী হলেন— রেহেনা মোস্তফা রানু (৪২) ও তার মেয়ে জুবাইদা বেগম (২১)। জুবাইদা চকরিয়া সরকারি কলেজের অর্থনীতির অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাদের বাড়ি পেকুয়া সদর ইউনিয়নের সরকারি ঘোনা এলাকায়।
তবে পেকুয়া থানা পুলিশ দাবি করেছে, থানায় ঢুকে পুলিশের ওপর হামলা এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে জুবাইদা বেগম (২২) ও তার মা রেহেনা মোস্তফা রানুকে (৪৫) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পেকুয়ার ইউএনও মোবাইল কোর্টে তাদের এক মাসের সাজা দেয়। পুলিশের মতে, আহত পুলিশ সদস্যরা হলেনÑনিপা মুর্শেদি (৩৪), নাসরিন সুলতানা রিনা (৩০) ও তছলিমা বেগম (৩১)।
পেকুয়া থানার ভেতরে এ ঘটনার সময় মা-মেয়ের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন মনজিলা বেগম (৬০)। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমি জুবাইদা ও তার মায়ের সঙ্গে থানায় গিয়েছিলাম। মামলার তদন্ত নিয়ে তাদের কথা বলতে শুনছিলাম। তখন শুনি, মামলার পক্ষে রিপোর্ট দেওয়ার কথা বলে এসআই পল্লব ২০ হাজার টাকা নিয়েছেন। কিন্তু পরে উল্টো রিপোর্ট দিয়েছেন। তাই জুবাইদা টাকা ফেরত চাইছিল।
প্রত্যক্ষদর্শী এ মহিলা বলেন, হঠাৎ পল্লব খুব রেগে গিয়ে মা-মেয়েকে চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করেন। পরে মহিলা পুলিশ এসে তাদের মারতে মারতে থানার গেট পর্যন্ত নিয়ে যায়। এরপর থানার ভেতর থেকে অন্য সবাইকে বের করে দেওয়া হয় এবং তাদের বেধড়ক মারধর করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, কলেজছাত্রী জুবাইদার আচরণও কিছুটা আক্রমণাত্মক ছিল। দীর্ঘদিনের হতাশায় ন্যায়বিচার চাওয়ার সময়ে তার আচরণ উগ্র হয়ে উঠেছিল মনে করা হচ্ছে।
ওই পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ থেকেই মূলত ঘটনার সূত্রপাত। জুবাইদার বাবা নুরুল আবছার মারা যান ২০১৩ সালের ২৩ মে। আইন অনুযায়ী, জুবাইদা তার বাবার স্থাবর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। সম্পত্তির অংশ চাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে জুবাইদার দাদার বাড়ির লোকজন তার পিতৃপরিচয় অস্বীকার করে আসছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও তাকে ওয়ারিশ সনদ দেওয়া হয়নি।
পরিবারের দাবি, স্থানীয় নারী ইউপি সদস্য বিজু (জুবাইদার ফুপু) এক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেন। সম্পত্তির অধিকার ফিরে পেতে আইনের আশ্রয় নেন জুবাইদা। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পান পেকুয়া থানার এসআই পল্লব কুমার ঘোষ। তাদের অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদনে তাদের পক্ষে রিপোর্ট দিতে ২০ হাজার টাকা ঘুস নেন পল্লব। কিন্তু পরে প্রতিবেদন জমা দেন জুবাইদার বিপক্ষে।
ভুক্তভোগী জুবাইদার খালা আমেনা বেগম বলেন, সোনার গয়না বন্ধক রেখে ২০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। তারপরও উল্টো রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, টাকা ফেরত চাইতে আমার বোন ও ভাগনি থানায় গিয়েছিল। থানার এসআই পল্লব ক্ষিপ্ত হয়ে মা–মেয়েকে মারধর করেন। এতে তারা গুরুতর আহত হন। পরে বিষয়টি আড়াল করতে ইউএনওকে ডেকে এনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজার জেলা কারাগারে বোন ও ভাগনির সঙ্গে দেখা করেন আমেনা বেগম। তিনি জানান, রেহেনা মোস্তফার মুখ ও চোখে গভীর জখমের চিহ্ন রয়েছে। জুবাইদার বাহু, থুতনি ও বুকেও স্পষ্ট আঘাতের দাগ দেখা গেছে।
জেলা কারাগারের একটি সূত্র জানায়, পুলিশ মা-মেয়েকে কারাগারে আনার সময় তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। প্রথমে গ্রহণ না করে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়, পরে ম্যাজিস্ট্রেটের সাক্ষ্য ও সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্রের ভিত্তিতে কারাগারে গ্রহণ করা হয়। তবে এসআই পল্লব কুমার মারধর ও ঘুস নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
পেকুয়া থানার ওসি খাইরুল আলম বলেন, মা-মেয়ে থানায় এসে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে, ঘুসের বিষয়টি সঠিক নয়। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল সাকিব সাংবাদিকদের জানান, মা-মেয়েসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে মারধর করেছে বলে থানা থেকে জানানো হয়। তিনি বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
পেকুয়ার ইউএনও মাহবুবুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, তখন পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মা-মেয়েকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

