নানা সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে চট্রগ্রামের জাহাজ নির্মাণ শিল্প । নতুন নতুন জাহাজ নির্মাণ করে আবার বিদেশেও রপ্তানি করছে। মন্দায় নিবু নিবু জ্বলতে থাকা চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আবার আলো ছড়াতে শুরু করেছে। বর্তমানে দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য ১৫টি জাহাজ নির্মাণ করছে ওয়েস্টার্ন মেরিন।
বাংলাদেশ থেকে বিদেশে রপ্তানি হওয়া জাহাজের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ছিল ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড। এটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ২০ বছরে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাহাজ রপ্তানি করে আসছে। করোনা মহামারি, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানান অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে প্রতিষ্ঠানটি সংকটে পড়েছিল। শুধু ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড নয়, বিশ্বের আরো বেশ কয়েকটি শিপইয়ার্ড একই ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সরেজমিনে গিয়ে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কোলাগাঁও ইউনিয়নে কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডে দেখা গেছে কর্মচাঞ্চল্য। নতুন উদ্যমে কার্যক্রম শুরু করে দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজেদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করতে কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিরা।
জানা গেছে, জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নতুন নয়। চট্টগ্রামের ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড ছাড়াও নারায়ণগঞ্জের আনন্দ শিপইয়ার্ড জাহাজ নির্মাণ শিল্পে অবদান রেখে চলেছেন। রপ্তানির বাজারে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকারি কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে খুঁড়িয়ে চলছে দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প, এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে জাহাজ শিল্পের জন্য আলাদা প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তার দাবি জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড লিমিটেড বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছেন তারা। এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিমুখী জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) তালিকাভুক্ত একটি কোম্পানি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৩৯টি জাহাজ রপ্তানি করেছে। ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, মোনাকো, তানজানিয়া, উগান্ডা, ইকুয়েডর, নিউজিল্যান্ড, গাম্বিয়া, কেনিয়া, ভারত, পাকিস্তান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয় এসব জাহাজ। এসব রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রায় ১৪১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে, যা দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। এছাড়া ওয়েস্টার্ন মেরিন দেশের বিভিন্ন জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ১০০টিরও বেশি জলযান নির্মাণ করেছে। যার অধিকাংশই রপ্তানি হয়েছে।
ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড জানিয়েছে, কর্ণফুলী নদীর তীরে ৩৪ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই শিপইয়ার্ডে আধুনিক অবকাঠামো ও উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। বৈশ্বিক মন্দা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পুরোদমে জাহাজ নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এখানে বর্তমানে প্রায় এক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। বর্তমানে শিপইয়ার্ডটিতে মোট ১৫টি জাহাজ নির্মাণাধীন রয়েছে। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রপ্তানির জন্য দুটি অয়েল ট্যাংকার ও দুটি ল্যান্ডিং ক্রাফট নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ১০৯ মিটার দৈর্ঘ্যের দুটি ট্যাংকার এবং ৬ হাজার ৫০০ টন ধারণক্ষমতার কার্গো জাহাজ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্মাণাধীন চারটি জাহাজের মূল্য ২৫০ কোটি টাকারও বেশি। পাশাপাশি নরওয়ের ক্রেতার জন্য একটি ফিশিং ভেসেল এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য দুটি ল্যান্ডিং ক্রাফট নির্মাণাধীন রয়েছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য আরো আটটি কার্গো ভেসেল নির্মাণ করা হচ্ছে। ওয়েস্টার্ন মেরিনের পাঁচটি স্লিপওয়ে রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি একই সময়ে ৮ থেকে ১০টি জাহাজ নির্মাণে সক্ষম।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন প্রকল্পগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে ওয়েস্টার্ন মেরিন। একই সঙ্গে পটিয়ার এই শিল্প প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন গতি সঞ্চার হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন সোহেল হাসান আমার দেশকে বলেন, ‘বর্তমানে ওয়েস্টার্ন মেরিন ১৩৫ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ১২ হাজার টন ধারণক্ষমতার জাহাজ নির্মাণে সক্ষম। দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করার পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। জাহাজ রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি দেশীয় বাজারে জাহাজ নির্মাণ করে আমদানি-নির্ভরতা কমানো হচ্ছে। একই সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধিতেও অবদান রাখছে ওয়েস্টার্ন মেরিন।’
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচিত পরিচালক শফিউল আলম বাদশা আমার দেশকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম দেশের জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ভৌগোলিক অবস্থান, দক্ষ জনশক্তি, সমুদ্রবন্দর এবং দীর্ঘদিনের শিল্প অভিজ্ঞতার কারণে এ খাতের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের নীতিগত সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে আরো শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে। এ শিল্পের বিকাশ শুধু রপ্তানি আয়ই বাড়াবে না, বরং বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


৪৯০০ বড় গ্রাহকের কবজায় ৫.৭৫ লাখ কোটি টাকার ঋণ