চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল ছলিমপুর ও আলীনগরে অবস্থিত র্যাব ও পুলিশের দুটি ক্যাম্পের ওপর রাতভর একযোগে সশস্ত্র হামলার পর, সকাল থেকে পুরো এলাকা ঘিরে অভিযান চালাচ্ছে যৌথ বাহিনী।
হামলার আগে আলীনগরের তিনটি পয়েন্ট আর জঙ্গল ছলিমপুরের দুটি পয়েন্টে রাস্তা কেটে দেয় সন্ত্রাসীরা। আর এ কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যানবাহন অবাধে চলাচল করতে পারছে না; একরকম পায়ে হেঁটে বিশাল এই এলাকায় অভিযান চালাতে হচ্ছে। এ সময় সন্দেহভাজন কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। অভিযান শেষে যাচাই-বাছাইয়ের পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সূত্র জানায়, রোববার দিবাগত রাত ১২টার পর থেকে বৃষ্টিপাত শুরু হয় ছলিমপুর এলাকায়। এতে পুরো পাহাড়ি এলাকায় নিস্তব্ধতা নেমে আসে। রাত ১টার দিকে জঙ্গল ছলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় অবস্থিত র্যাব ও পুলিশের দুটি ক্যাম্পের ওপর একযোগে যৌথ হামলা শুরু করে সন্ত্রাসীরা। একদল সন্ত্রাসী ৪০ থেকে ৫০ জন করে ভাগ হয়ে দুটি ক্যাম্পের ওপর এই হামলা চালায়। হঠাৎ করে অতর্কিত আক্রমণে প্রথমে হতবিহ্বল হয়ে পড়লেও মুহূর্তেই পরিস্থিতি সামলে উঠে পাল্টা গুলি ছুড়তে থাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। হামলার আগে অন্তত চারটি পয়েন্টে এক্সকাভেটর (মাটি কাটার যন্ত্র) দিয়ে রাস্তা কেটে ফেলে সন্ত্রাসীরা। র্যাব ক্যাম্পের একটি সীমানাপ্রাচীরও এক্সকাভেটর দিয়ে ভেঙে ক্যাম্পের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা চালায় তারা।
রাত সাড়ে ৩টা পর্যন্ত সন্ত্রাসীদের সঙ্গে র্যাব ও পুলিশ ক্যাম্পের সদস্যদের গুলিবিনিময় চলে। খবর পেয়ে রাতেই অতিরিক্ত ফোর্স পাঠানো হয়। রাতের অন্ধকারে ভেতরে প্রবেশ না করলেও চারপাাশে শক্ত অবস্থান নেয় তারা। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে সন্ত্রাসীরা পিছু হটতে থাকে। রাত সাড়ে ৩টার পর গোলাগুলির শব্দ কমে আসতে থাকে। এ সময় রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি তৈরি হয় পুরো পাহাড়ি এলাকায়।
র্যাব–৭-এর কমান্ডিং কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান জানান, রাত ১টার পর হঠাৎ ক্যাম্পের চারপাশে গুলির শব্দ বাড়তে থাকে। দুই ঘণ্টা ধরে তারা গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে আমরাও পাল্টা গুলি চালিয়েছি।
জঙ্গল ছলিমপুর র্যাব ক্যাম্পে থাকা র্যাবের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাত সাড়ে ১২টার দিকে হঠাৎ করেই স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের তীব্র গর্জন শোনা যায়। হামলাকারীরা একে–৪৭সহ ভারী অস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে ধারণা। র্যাব সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, গুলির ঘনত্ব ও তীব্রতা দেখে ধারণা করা হয়—হামলাকারীর সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০ জনের মতো হতে পারে। দুই ক্যাম্পকে লক্ষ্য করেই গুলি ছোড়া হয় বলে র্যাব সূত্রের দাবি। র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা গুলি চালিয়ে অবস্থান ধরে রাখেন। রাত সাড়ে ৩টা পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি চলে।
হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সদস্যরা নিরাপদে আছেন। এখন যৌথ বাহিনী এলাকায় প্রবেশ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কাজ শুরু করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘হামলাকারীরা যে সংগঠিত এবং আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এলাকাটি পাহাড়ি হওয়ায় চোরাগোপ্তা হামলার সুযোগ তারা নিতে চেয়েছে। আমরা সতর্ক অবস্থানে আছি।’
রাত ৩টার পর গুলিবিনিময় কমে আসে। ভোর ৫টার দিকে পাঁচ শতাধিক র্যাব, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী এলাকায় অভিযান শুরু করে। র্যাব সদস্য হত্যাসহ অসংখ্য মামলার আসামি জঙ্গল ছলিমপুরের ত্রাস সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরা সংঘবদ্ধভাবে এই হামলা চালিয়েছে বলে জানান তিনি। অভিযান শেষে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানিয়েছেন র্যাব ও পুলিশের কর্মকর্তারা।
অভিযানে অংশ নেওয়া জেলা পুলিশের এএসপি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা জানান, একে তো দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, তার ওপর বিপুলসংখ্যক সাধারণ দরিদ্র মানুষ এলাকায় বসবাস করে। তাই সতর্কতার সঙ্গে অভিযান চালাতে হচ্ছে। বিভিন্ন পয়েন্টে রাস্তা কেটে ফেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যানবাহন অবাধে চলাচল করতে পারছে না। যৌথ বাহিনীর সদস্যরা কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে প্রায় ৩ হাজার একর পাহাড়ি এলাকায় পায়ে হেঁটে অভিযান পরিচালনা করছেন। ইতিমধ্যে সন্দেহভাজন কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। অভিযানের পর যাচাই-বাছাই শেষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জঙ্গল ছলিমপুর এলাকাকে ঘিরে পুলিশ ট্রেনিং একাডেমি, জেলা কারাগারসহ বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। ঈদের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এখানে পরিদর্শনে এসে কয়েকটি প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


সলিমপুরে র্যাব ক্যাম্পে সন্ত্রাসী হামলা, চলছে যৌথ বাহিনীর অভিযান