ট্রাক আটকে কারাগারে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক, হদিস নেই ২০ টন সারের

ট্রাক আটকে কারাগারে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক, হদিস নেই
২০ টন সারের
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক আইয়ুব আলী

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূল থেকে গত ১ সেপ্টেম্বর পাচারের সন্দেহে ৪১০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্ট গার্ড। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে ১ অক্টোবর সীতাকুণ্ড মডেল থানা প্রাঙ্গণে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে প্রকাশ্য নিলামে সারগুলো বিক্রি করা হয়। সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে সন্দ্বীপের হারামিয়া এলাকার মো. ফখরুল ইসলাম সারগুলো কেনেন। তার দাবি, ভ্যাট ও কর পরিশোধ করেই তিনি নিয়মমাফিক সার কিনেছেন।

বিজ্ঞাপন

এর পাঁচ দিন পর, ৬ অক্টোবর গুলিয়াখালী উপকূলীয় এলাকায় সারবোঝাই ট্রাক চলাচল নিয়ে সন্দেহ হলে কৃষি বিভাগকে খবর দেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক আইয়ুব আলী।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্দ্বীপে সার পরিবহনের প্রচলিত রুট বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট হলেও ট্রাকটি গুলিয়াখালী উপকূলীয় সড়ক দিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। খবর পেয়ে কৃষি কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে চালকদের কাছে বৈধ কাগজপত্র দেখতে চান। তবে তাদের দাবি, চালকেরা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।

তৎকালীন উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ইশতিয়াক আহমেদ জানান, পুলিশ তখন জানিয়েছিল আইয়ুব আলীকে থানায় নিয়ে একটি কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে, কিন্তু পরে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

অন্যদিকে সারের ক্রেতা ফখরুল ইসলামের অভিযোগ, ট্রাক যেতে দেওয়ার জন্য আইয়ুব আলী তার কাছে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। এ অভিযোগে দ্রুত বিচার আইনে মামলা হলে পরদিন আইয়ুব আলীকে কারাগারে পাঠানো হয়।

তবে মামলার অভিযোগের সঙ্গে বাদী ও ট্রাকচালকের বক্তব্যের বিস্তর ফারাক রয়েছে। সার ক্রেতা ফখরুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমে স্বীকার করেছেন যে, আইয়ুব আলী তার কাছে সরাসরি কোনো টাকা চাননি বরং পুলিশের সঙ্গে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে তাকে থানায় নেওয়া হয়। ট্রাকচালক মোহাম্মদ পাভেলের বক্তব্যও একই রকম। তার দাবি, আইয়ুব আলী কোনো চাঁদা চাননি, কেবল ট্রাকের চাবি নিতে চেয়েছিলেন। এসব অমিল মামলার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই পরিষ্কার হওয়া জরুরি।

সার পরিবহনের বৈধ কাগজপত্র নিয়ে দুই দপ্তরের বক্তব্যে গরমিল দেখা গেছে। তৎকালীন সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলমগীর হোসেনের দাবি, বৈধ নিলামের কাগজ নিয়েই সার সন্দ্বীপে নেওয়া হচ্ছিল। বিপরীতে তৎকালীন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কল্পনা রহমান জানান, ঘটনাস্থলে চালকেরা কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি; পুলিশ পরবর্তীতে নিলামের কাগজ এনেছিল।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—নিলামে বিক্রি হওয়া ৪১০ বস্তা বা প্রায় ২০ টন সার শেষ পর্যন্ত কোথায় গেল? ক্রেতা ও পুলিশের দাবি সার সন্দ্বীপে গেছে, কিন্তু এর কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই কৃষি বিভাগের কাছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আফরোজা মারমা জানান, গুলিয়াখালীর ওই সার নিলাম বা হস্তান্তরের বিষয়ে তাদের কিছুই জানানো হয়নি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জানান, সারগুলো নিলামে বিক্রি হলেও বিক্রির পর কোথায় গেছে তার কোনো হদিস নেই। কৃষি উপকরণ হওয়ায় সারগুলো কোথায় আছে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।

কৃষক পরিবারের দুর্দশার খবর পেয়ে গত ৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় তার বাড়িতে যান তৎকালীন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কল্পনা রহমান ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ইশতিয়াক আহমেদ। তারা পরিবারটিকে আইনি সহায়তার আশ্বাস দেন। কল্পনা রহমানের দাবি, আইয়ুব আলীকে সাজানো মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। এর কিছুদিন পর কল্পনা রহমানকে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের ‘মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন কর্মকর্তা’ এবং ইশতিয়াক আহমেদকে টাঙ্গাইলে বদলি করা হয়।

এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন উঠলেও বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্পষ্ট করেছেন যে, কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর কারণে তাদের বদলি করা হয়নি। কল্পনা রহমান নিজেই নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় বদলির আবেদন করেছিলেন এবং ১০ অক্টোবর আদেশ পাওয়ার পর ১৮ অক্টোবর নতুন কর্মস্থলে যোগ দেন।

গত ২০ অক্টোবর উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা আইয়ুব আলীর গ্রেপ্তার ও তার পরিবারের দুরবস্থার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন। সভার সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম জানান, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বিষয়টি সমাধান করতে হবে। বদলি হওয়া কর্মকর্তাসহ কৃষি বিভাগ এবং উপজেলা প্রশাসন কারাগারে থাকা কৃষক পরিবারের পাশে থাকবে এবং তাকে মুক্ত করতে সব ধরনের আইনি সহায়তা দেওয়া হবে।

তবে সীতাকুণ্ড মডেল থানার ওসি সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...