সন্ধ্যাটা অন্য দিনের মতোই ছিল বায়েজিদের রৌফাবাদে।
গলির দুই ধারে সেমিপাকা বাসাগুলোয় তখন রান্নার ধোঁয়া উঠছে। কেউ দরজায় বসে গল্প করছেন, কেউ বা সন্তানকে ডাকছেন ঘরে ফেরার জন্য। চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার এই পাড়াটি সন্ধ্যায় এমনই থাকে-একটু কোলাহল, একটু শান্তি। সেই শান্তি ভেঙে খান খান হয়ে যায় রাত ১০টার আগে আগে। পরপর কয়েকটি গুলির শব্দ। তারপর নিস্তব্ধতা।
জোসনা বেগম দরজা বন্ধ করে দেন সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু দরজার ফাঁক দিয়ে চোখ সরাতে পারেন না। দেখেন, সরু গলিতে একটি ছেলে মাটিতে পড়ে আছেন। মুখোশ পরা চারজন এগিয়ে আসছে। দুজন ছেলেটির দুই পা চেপে ধরল। বাকি দুজন ঠান্ডা মাথায়, নির্বিকারভাবে মাথায় দুটি, বুকে তিনটি গুলি করল। তারপর চলে গেল। যেন কিছুই হয়নি। গলিতে পড়ে রইলেন হাসান রাজু। বয়স চব্বিশ।
রাজু এসেছিলেন ৫ মে। রাউজান উপজেলার কদলপুরের এই দিনমজুর ছেলেটি মাঝে মাঝে আসতেন বোন রোমা আক্তারের কাছে। চট্টগ্রাম শহরে আসা মানে একটু অন্যরকম লাগা পাড়ার গলি, শহরের গোলমাল, বোনের হাতের রান্না।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বের হয়েছিলেন একটু হাঁটতে। রোজকার মতো সন্ধ্যার বাতাস গায়ে মেখে ঘুরে আসবেন- এটুকুই হয়তো ছিল মনে। কিন্তু তিনি আর ফেরেননি।
বোন রোমা আক্তার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, 'তার সঙ্গে কারও কোনো বিরোধ ছিল না। সে দিনমজুর মানুষ। কাজ করে খায়। এভাবে কেন মারল তাকে- আমি বুঝতে পারছি না।' দুই ফুটের গলি, পাঁচটি গুলি।
রোমা আক্তারের বাসায় যাওয়ার গলিটা দেখলে বুকটা ছোট হয়ে আসে। এতটাই সরু যে পাশাপাশি দুজন হাঁটা যায় না। ইট-বালুর দেওয়াল দুই পাশে।
সেই গলিতেই শেষ দৌড় দিয়েছিলেন রাজু। বোনের বাসার দরজা তখন মাত্র কয়েক হাত দূরে। হামলাকারীরা প্রথমে পায়ে গুলি করে। পড়ে যান রাজু। উঠে দাঁড়ানোর আর সুযোগ পাননি।
চারজন এলেন। চারজনের হাতেই পিস্তল। নিখুঁত পেশাদার। কাজ সারল তারা। এই একই গলির দুই পাশে সেদিন রাতে ছিলেন ১৫ থেকে ২০টি বাসার মানুষ। কিন্তু গুলির শব্দে সবাই দরজা বন্ধ করে ভেতরে চলে গেছেন। ভয় তাদের নিথর করে দিয়েছিল।
শুধু জোসনা বেগম দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলেন। আর দেখেই বুঝলেন- এ হত্যা পরিকল্পিত। এ হত্যা ঠান্ডা।
পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকতে পারে পুরোনো শত্রুতা। গত ২৬ এপ্রিল রাউজানের কদলপুরে গুলিতে নিহত হন নাসির উদ্দিন প্রবাসফেরত এক যুবদল কর্মী। সেই হত্যার ঘটনায় নাসিরের মেয়ে লাভলী আক্তার অভিযোগ তুলেছিলেন হাসান রাজুর বিরুদ্ধে। মামলায় রাজু ছিলেন ৭ নম্বর আসামি। দুই সপ্তাহও পেরোয়নি। রাজুও চলে গেলেন একইভাবে গুলিতে।
এদিকে গলিতে হত্যাকাণ্ডের সময় ছোট্ট রেশমা আক্তারের চোখে এসে লাগে একটি গুলি। বড়দের লড়াইয়ে, বড়দের হিসাব-নিকাশে- একটি শিশুর চোখ আজ অন্ধকারের মুখে।
বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল করিম জানান, 'প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে পূর্ববিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।'
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

