চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান শিল্প, বাণিজ্য ও পর্যটননগরী সীতাকুণ্ড পৌরসভা এখন অনিয়ম, দুর্নীতি আর নাগরিক হয়রানির এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও এ কার্যালয়ে বদলায়নি সিন্ডিকেট বাণিজ্য। সরকারি নির্ধারিত ফি পরিশোধের পরও মোটা অঙ্কের ঘুস ছাড়া নড়ছে না কোনো ফাইল। জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ, ট্রেড লাইসেন্স থেকে শুরু করে ভবনের নকশা অনুমোদন, প্রতিটি টেবিল যেন টোল প্লাজা। স্থানীয়দের মতে, নাগরিক সেবার নামে এখানে চলছে প্রকাশ্য জিম্মিদশা। বিশেষ করে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী নূরনবী এবং মিরসরাই থেকে বদলি হয়ে আসা নকশাকার মাসুমের সিন্ডিকেটের কারণে হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ নাগরিক ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ও হয়রানি চলছে ভবনের নকশা অনুমোদন কার্যক্রম নিয়ে। বর্তমানে পৌরসভায় শতাধিক নকশা অনুমোদনের আবেদন ফাইলবন্দি হয়ে রয়েছে। গত ৮ জুন এক সভায় ৬১টি আবেদনের মধ্যে ৫৫টিই বিভিন্ন ঠুনকো অজুহাতে স্থগিত রাখা হয়। নকশাকার মাসুম ও নির্বাহী প্রকৌশলী নূরনবীর কৃত্রিম জটিলতায় সাধারণ ভবন মালিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আর্থিক ও মানসিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর শামসুল আলম আজাদ আমার দেশকে বলেন, জনপ্রতিনিধি না থাকায় বর্তমানে জবাবদিহিতা একেবারেই কমে গেছে এবং সেই সুযোগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা বেড়েছে। অতীতে সীতাকুণ্ড কলেজ রোড এলাকায় মাত্র ছয় ফুট রাস্তার পাশে বিশাল পুকুরের মধ্যে আটতলা এবং সুবাহানবাগ এলাকায় ১০ ফুট রাস্তার পাশে আটতলা ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। আগে যেসব ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের সব ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে, এখন সেখানে সাধারণ নাগরিকদের ফাইল সামান্য অজুহাতে আটকে রাখা হচ্ছে। তিনি পৌরসভার নকশাকার মাসুমের বিরুদ্ধে সরাসরি হয়রানি ও ফাইল আটকে রাখার অভিযোগ তোলেন।
সীতাকুণ্ড ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আনোয়ার হোসেন সোহেল কর্মকর্তাদের হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়টি স্পষ্ট করে আমার দেশকে বলেন, পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী নূরনবীসহ সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার কারণে নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়াটি এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
স্থপতি ডিজাইন অ্যান্ড কনসালটিং ফার্মের প্রকৌশলী কামরুদ্দোজা আমার দেশকে বলেন, সব নিয়ম মেনে আবেদন জমা দেওয়ার পরও অযথা ত্রুটি দেখিয়ে ফাইল ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। ঘুস বা আন্ডারহ্যান্ড লেনদেন ছাড়া অনুমোদন পাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব।
নকশা অনুমোদনে জালিয়াতি ও হয়রানির অভিযোগ এনেছেন স্থপতি ডিজাইন অ্যান্ড কনসালটেন্ট ফার্মের প্রকৌশলী কামরুজ্জামান। দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে এ পেশায় নিয়োজিত এ প্রকৌশলী সরাসরি মাসুম ও নূরনবীর দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে আমার দেশকে বলেন, অতীতে কখনো আমার নকশা অনুমোদনে কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু মিরসরাই থেকে নকশাকার মাসুম সীতাকুণ্ড পৌরসভায় যোগদানের পর থেকেই রাস্তা, ঘাট ও ইলেকট্রিক ও প্লাম্বিং ডিজাইন—এসব নিয়ে নানা অজুহাতে হয়রানি শুরু করেছেন।
পৌরসভার এ চরম অব্যবস্থাপনা ও হয়রানির বিষয়ে জানতে চাইলে পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে বর্তমান প্রশাসনের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

