পুরোনো জাহাজ আমদানিতে কড়াকড়ি, শঙ্কায় শিপিং খাত

পুরোনো জাহাজ আমদানিতে কড়াকড়ি, শঙ্কায় শিপিং খাত
আমার দেশ গ্রাফিক্স

দেশের সমুদ্র বাণিজ্যে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ বাড়ানোর উদ্যোগ যখন গতি পাচ্ছিল, তখনই পুরোনো জাহাজ আমদানিতে বয়সসীমা ২৫ বছর থেকে কমিয়ে ১০ বছর করেছে সরকার। এক লাফে ১৫ বছর কমানোয় ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে দেশি জাহাজের বহর বাড়ার গতি কমতে পারে এবং বিদেশি জাহাজের ওপর নির্ভরতা আরো বাড়বে।

অর্থ মন্ত্রণালয় গত জুনে অত্যন্ত গোপনে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ক্ষোভ দেখা দিয়েছে উদ্যোক্তা ও শিপিং ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তাদের দাবি, বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা সাধারণত ২০ বছরের কাছাকাছি বয়সের পুরোনো জাহাজ কিনে ব্যবসা করেন। হঠাৎ করে পুরোনো জাহাজ আমদানির বয়সসীমা কমিয়ে দেওয়ায় এ খাতের বিনিয়োগে স্থবিরতা নামবে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা হারাবে। কারণ, সমুদ্র বাণিজ্যের এই খাতে ভালো অবস্থান তৈরি করতে না পারলে শুধু জাহাজ ভাড়া বাবদই বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হবে প্রতি বছর।

বিজ্ঞাপন

সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশি পতাকাবাহী মাদার ভেসেলের সংখ্যা ১০৮টি। এর মধ্যে ৮৭টি বাল্ক কার্গো, আটটি কনটেইনারবাহী জাহাজ, পাঁচটি করে ট্যাংকার ও অয়েল ট্যাংকার, দুটি গ্যাস ক্যারিয়ার এবং একটি আদার্স কার্গোশিপ। মালিকানার দিক থেকে মেঘনা গ্রুপের ২৮টি, কেএসআরএমের ২৭টি, আকিজ গ্রুপের ১১টি, এইচআর শিপিং লাইন্সের আটটি এবং বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন ও ভ্যানগার্ড গ্রুপের সাতটি করে জাহাজ রয়েছে। বাকিগুলো রয়েছে বিভিন্ন ছোট কোম্পানির মালিকানায়।

সংশ্লিষ্টদের হিসাবে শুধু জাহাজ ভাড়া বাবদ বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়। বিপরীতে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজগুলো আয় করছে এক বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। তাদের দাবি, দেশি পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা ৫০০তে উন্নীত করা গেলে বছরে অন্তত আট বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার আমলেই পুরোনো জাহাজ আমদানির বয়সসীমা কমানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। বর্তমান সরকার তা বাস্তবায়ন করেছে। তবে এক লাফে ১৫ বছর কমিয়ে ১০ বছর করা হবেÑতা কারো ধারণায় ছিল না।

তিনি বলেন, বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কারণে সমুদ্র বাণিজ্য এখন চাপের মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন জাহাজ ও কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে পণ্য পরিবহনের জাহাজ সংকট ও ফ্রেট বেড়েছে। এ অবস্থায় দেশি পতাকাবাহী জাহাজ বাড়ানোর জন্য নীতিমালা সহজ করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু উল্টো আমদানির শর্ত কঠোর করা হয়েছে।

তিনি জানান, বর্তমানে বছরে পাঁচ হাজারের বেশি জাহাজ বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করছে। কিন্তু বাংলাদেশের মাদার ভেসেল আছে মাত্র ১০৮টি। এ সংখ্যা দ্রুত বাড়াতে না পারলে ভবিষ্যতে সমুদ্র বাণিজ্য টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে বাংলাদেশি মালিকানাধীন জাহাজের বহরে তিনটি রিকন্ডিশন্ড জাহাজ যুক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালে যুক্ত হয়েছিল আটটি। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আরো চারটি জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা সাধারণত কম-বেশি ২০ বছরের পুরোনো জাহাজ কেনে। এমন একটি বাল্ক জাহাজের দাম প্রকারভেদে ১৫ থেকে ১৬ মিলিয়ন ডলার। অয়েল ট্যাংকারের দাম ১৪ থেকে ১৫ মিলিয়ন এবং কনটেইনার জাহাজের দাম আট থেকে ৯ মিলিয়ন ডলার। একই ধরনের ১০ বছর বয়সি জাহাজ কিনতে গেলে ব্যয় হতে পারে এর দ্বিগুণেরও বেশি। অথচ জাহাজের বয়সের সঙ্গে ভাড়া সরাসরি বাড়ে না। ফলে বাড়তি বিনিয়োগের তুলনায় আয় বাড়ার নিশ্চয়তা নেই।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন চৌধুরী বলেন, গত দু-তিন বছর ধরে শিপিং খাতে বিনিয়োগ বাড়ছিল। ছোট উদ্যোক্তারাও কয়েকজন মিলে এক-দুটি জাহাজ কিনে ব্যবসায় আসছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের খাত হয়ে উঠছিল শিপিং ব্যবসা। কিন্তু এমন সময় এ আইনের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় খাতটির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়েছে।

এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, জাহাজ মালিক কিংবা কোম্পানিগুলো কখনই মাত্র ১০ বছর বয়সি জাহাজ বিক্রি করতে চাইবে না। বিক্রি করলেও তার দাম নতুন জাহাজ থেকে খুব একটা কম হবে না। ৫০ হাজার টন ধারণক্ষমতার ২০ বছর বয়সি একটি জাহাজ যেখানে ১৫-১৬ মিলিয়ন ডলারে পাওয়া যায়, সেখানে ১০ বছর বয়সি জাহাজের দাম ৪০ মিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। এ ধরনের খাতে বিনিয়োগ ছোট উদ্যোক্তাদের পক্ষে কঠিন।

তিনি বলেন, বিশ্বের কোনো বন্দর জাহাজ প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সসীমা যাচাই করে না। একটি জাহাজ ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে ৫০ থেকে ৬০ বছর অনায়াসে চালানো যায়। তাই দেশি পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা বাড়াতে পুরোনো জাহাজ আমদানির সুযোগ আরো সহজ করা প্রয়োজন। অন্যথায় জাহাজ ভাড়া বাবদ প্রতিবছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাবে।

নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থা আঙ্কটার্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি দেশের সমুদ্র বাণিজ্যের ৪০ শতাংশ দেশি, ৪০ শতাংশ বিদেশি এবং ২০ শতাংশ যৌথ মালিকানাধীন জাহাজের মাধ্যমে পরিবহনের সুযোগ রয়েছে। অথচ বাংলাদেশের ১০৮টি পতাকাবাহী জাহাজ বর্তমানে দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মাত্র ১১ শতাংশ চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম।

এর ওপর বাংলাদেশে রয়েছে ফ্লাগ প্রটেকশন আইন। অর্থাৎ, একই সময় একটি দেশি জাহাজ ও একটি বিদেশি জাহাজ জলসীমায় এলে দেশি জাহাজকে আগে বার্থিং দেওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে এ খাতে সক্ষমতা বাড়ানোর আইনগত অনেক সুবিধা বাংলাদেশের রয়েছে। কিন্তু বয়সসীমা-সংক্রান্ত এ আইনের ফলে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রাম নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন শেখ জালাল উদ্দিন গাজী বলেন, আমদানি করা পুরোনো জাহাজের বয়সসীমা এনবিআর নির্ধারণ করেছে। এ বিষয়ে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মতামত নেওয়া হয়নি। কম বয়সি জাহাজ আমদানি করলে বহরের গড় বয়স কম থাকবে—এটি সিদ্ধান্তের একটি কারণ হতে পারে। এতে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ফ্রেটের ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা পেতে পারে। আরেকটি কারণ হতে পারে, ২০ বছর বয়সি একটি জাহাজ যতদিন সমুদ্রে চলতে পারবে, ১০ বছর বয়সি জাহাজ তারচেয়ে বেশিদিন চলতে পারবে। তবে তার মতে, বয়সসীমা কমানোর ফলে গত দু-তিন বছরে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের বহর দ্রুত বাড়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা কমে যেতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন