চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সমুদ্রের তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা একটি প্রভাবশালী চক্র। দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন করে চক্রটি উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের ১০০ একর কৃষি জমি ভরাট করেছে। কোথাও কোথাও ফসলও মাড়িয়ে দিচ্ছে তারা। প্রতিবাদ করলেই স্থানীয়দের পেতে হচ্ছে হুমকি, দেখানো হচ্ছে ভয়ভীতিও। প্রতিদিন জেলেদের শতশত জাল নষ্ট করছে বালুর ড্রেজারগুলো। অবশেষে এসব আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে ইউএনও কার্যালয়ে এসে বিক্ষোভ করেছেন জেলেরা।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ২টায় সীতাকুণ্ড উপজেলা পরিষদ চত্বরে বালু উত্তোলন বন্ধ এবং জালের ক্ষতিপূরণের দাবিতে বিক্ষোভ করেন কয়েকশ জেলে। এ সময় তারা বলেন, “বালু খেকোর দল আমাদের শত শত জাল কেটে ছিন্নভিন্ন করেছে। নদীতে জাল ফেললেই তারা কেটে টুকরো টুকরো করে দেয়। গত কয়েক মাসে বালু খেকোদের এমন আচরণে কয়েকশ জেলে পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। এখনই যদি এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে আমরা জেলেরা একেবারে সর্বস্বান্ত হয়ে যাব।”
অভিযোগ উঠেছে, উপজেলার সৈয়দপুরে কথিত জামায়াত নেতা রায়হান উদ্দিন প্রকাশ রায়হান কমিশনার এবং কুমিরার জামায়াত নেতা জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বে এমআর ট্রেডার্সের নামে, প্যাসিফিক জিন্সের জন্য প্রতিদিন লাখ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এ কাজে বিএনপি নেতারাও প্রতি ফুট ৪০ পয়সা করে কমিশন আদায় করছে। ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি কাজী এনামুল বারী, সাধারণ সম্পাদক আইনুল কামাল, যুবদল মনসেন আলী, বিএনপি নেতা বোরহান উদ্দিন প্রকাশ আলাউদ্দিন, ইউনিয়ন যুবদলের সেক্রেটারি মো. শওকত, সহ-সভাপতি মহসীন, সাংগঠনিক সম্পাদক হালিম, নুর উদ্দীন, হান্নান, আমির হোসেন ও কৃষকদল নেতা এনাম হোসেন এই কাজে জড়িত রয়েছেন। তাদের পাহারায় এলাকায় ব্যাপকভাবে বালু উত্তোলন হচ্ছে। প্যাসিফিক জিন্সের ১০০ একর কৃষি জমি ভরাটে স্থানীয়দের আপত্তি সত্ত্বেও তারা সহযোগিতা করছেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ থেকে রাজনৈতিক বলয় খাটিয়ে আনা কথিত অনুমতিপত্র ব্যবহার করে জামায়াত নেতা রায়হান উদ্দিন ও জসিম উদ্দিন নির্বিচারে বালু উত্তোলন করছে। এতে ফসল নষ্ট হচ্ছে এবং কৃষি জমি আশঙ্কাজনক হারে কমছে।
গত বুধবার মুরাদপুর ইউনিয়নের গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত এলাকা থেকে উপজেলা পরিষদে আসা জেলেরা অভিযোগ করেন, সাগর উপকূলে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ড্রেজার ও বাল্কহেডের মাধ্যমে তাদের মাছ ধরার জাল কেটে ফেলা হচ্ছে। নদীতে জাল ফেললেই তা কেটে নষ্ট করে দেওয়া হয়। প্রতিবাদ করলে জেলেদের মারধর ও হুমকি দেওয়া হয়।
জেলেরা আরও জানান, গত বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি জাল কাটার প্রতিবাদ করতে গিয়ে রাম জলদাস নামের এক জেলেকে মারধর করে নদীতে ফেলে হত্যা করা হয়। তার ছোট ভাই লিটন জলদাসকে অপহরণ করা হয়। চার দিন পর গুলিয়াখালী সমুদ্রতীরে রাম জলদাসের লাশ ভেসে ওঠে। সেই ঘটনার কথা মনে হলে এখনও তারা আতঙ্কিত হন। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে জেলেরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে এসেছেন।
বিক্ষোভ শেষে জেলেরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলামের বরাবরে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, গত কয়েক মাসে দুই শতাধিক জেলের অন্তত ৮০০টি মাছ ধরার জাল কেটে ফেলা হয়েছে। এতে প্রায় ২ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন এনজিও সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে জাল ক্রয় করলেও বর্তমানে কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে না পারায় জেলেরা চরম বিপাকে পড়েছেন।
অভিযোগে বলা হয়, কনস্ট্রা এইড লিমিটেড, ডিপ ডিগার্স লিমিটেড ও এমআর ট্রেডার্স লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় এলাকায় বালু উত্তোলন করছে। এর মধ্যে কনস্ট্রা এইড ও ডিপ ডিগার্সের মালিক বিএনপি নেতারা, আর এমআর ট্রেডার্সের মালিক জামায়াত নেতারা। অভিযোগ উঠেছে, রায়হান, জসিমসহ জামায়াতের কর্মী পর্যায়ের কয়েকজনকে দিয়ে এসব কাজ চালানো হচ্ছে এবং উপজেলা শীর্ষ নেতারাও এতে জড়িত। এর আগে সৈয়দপুরে বালু উত্তোলন করতে গেলে জামায়াত নেতাদের ধাওয়া দিয়েছিলেন স্থানীয়রা।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোতাছিম বিল্লাহ জানান, শুধুমাত্র জাল কেটে জেলেদের ক্ষতি করা হচ্ছে তা নয়, উপকূলে অব্যাহত বালু উত্তোলনের ফলে মাছের আবাসস্থল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ড্রেজারের মাধ্যমে নদী ও সাগরের তলদেশ পরিবর্তিত হওয়ায় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে। এছাড়া পানির ঘোলা ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় মাছের খাদ্য ও বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে।
জেলেদের বিক্ষোভ ও লিখিত অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম বলেন, জেলেদের অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমআর ট্রেডার্সের মালিক রায়হান উদ্দিন অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমি বালু উত্তোলন করছি কুমিরায়, সৈয়দপুরে কোন শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বালু উত্তোলন করে দিচ্ছি না।” এ সময় তার উত্তোলিত বালু কোথায় রাখা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি।
সৈয়দপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি কাজী এনামুল বারী বলেন, “আমি বালু উত্তোলনের বিষয়ে অবগত নই। কমিশন গ্রহণের বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমাদের দলের কেউ পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে আমরা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব।”
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

