কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার পাঁচোড়া গ্রামে গভীর রাতে ঘরে ঢুকে জাহানারা বেগম (৬৫) নামের এক বৃদ্ধাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় প্রতিবেশী মিজানুর রহমানকে (৬০) প্রধান আসামি করে বুড়িচং থানায় মামলা করেছেন আহতের ছেলে রমজান হোসেন।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর রাত সাড়ে 3টার দিকে পাঁচোড়া গ্রামের একটি বাড়ির নিচতলায় নিজের শয়নকক্ষে ঘুমিয়ে ছিলেন জাহানারা বেগম। এ সময় মিজানুর রহমানসহ অজ্ঞাতনামা দুই থেকে তিনজন ঘরে ঢুকে তাকে ধারালো দা দিয়ে কুপিয়ে জখম করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে তার মাথার খুলি ভেঙে যায় এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
পরে স্বজনেরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে কুমিল্লা ট্রমা সেন্টারে নেওয়া হয় বলেও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন মিজানুর রহমানকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন বলে মামলায় দাবি করা হয়।
ঘটনার পর প্রকৃত হামলাকারী কারা, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য মেলেনি। এজাহারে মিজানুর রহমানকে প্রধান অভিযুক্ত করা হলেও অজ্ঞাতনামা আরও দুই থেকে তিনজনের সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগ উঠেছে, এ ঘটনার পেছনে স্বামী-স্ত্রীর পারিবারিক দ্বন্দ্ব বা পূর্বশত্রুতার বিষয় থাকতে পারে। সেই বিরোধের জেরে মিজানুর রহমানকে ফাঁসানো হয়েছে কি না, তা নিয়েও স্থানীয়দের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন।
এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে আটক মিজানুর রহমানকে রশি দিয়ে বেঁধে নির্যাতন করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, স্থানীয় কয়েক ব্যক্তি তাকে ছুরি দিয়ে আঘাত ও শারীরিক নির্যাতন করছেন।
আহত জাহানারা বেগমকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার কথা এজাহারে উল্লেখ থাকলেও সেখানে তার ভর্তির কোনো দাপ্তরিক নথি পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া মামলার সাক্ষী শাহানা আক্তারকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, আমাকে সাক্ষী করা হয়েছে অথচ আমি কিছুই জানি না এবং এ ঘটনার বিষয়ে আমি কিছুই দেখিনি।
বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ
এদিকে পূর্বশত্রুতার জেরে মিজানুর রহমানকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্জন স্থানে মারধর, জোরপূর্বক তিনটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর গ্রহণ এবং নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে অপর একটি মামলা হয়েছে। এতে চারজনকে সুনির্দিষ্ট এবং অজ্ঞাতনামা আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, গত ৪ অক্টোবর দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে বুড়িদং উপজেলার রাজাপুর ও পাঁচোড়া এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি দলবদ্ধ হয়ে মিজানুর রহমানের বসতবাড়ির আঙিনায় প্রবেশ করেন। পরে তাকে জোরপূর্বক আটক করে পয়াতের জলা এলাকার রেললাইনসংলগ্ন একটি নির্জন স্থানে নিয়ে কিল-ঘুষি, লাথি ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ১০০ টাকা মূল্যমানের তিনটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক তার স্বাক্ষর নেওয়া হয় এবং সেই নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে স্থানীয় লোকজন ও পুলিশের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এই মামলায় মোহাম্মদ হান্নান (৪৫), রাসেল (৪০), মোহাম্মদ সোহেল (৪০) এবং মোহাম্মদ রমজান কালাম অপুর (৩২) নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
আটক মিজানুর রহমানের মেয়ে ফেরদৌসী জান্নাত দাবি করেন, ‘আমার বাবাকে এলাকার কিছু সন্ত্রাসী বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে অমানবিক শারীরিক নির্যাতন করেছে।’
এ বিষয়ে মামলার বাদী রমজান আলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
বুড়িচং থানার ওসি মো. লুৎফর রহমান জানান, এ ঘটনায় দুই পক্ষই মামলা করেছে। এর এক পক্ষ থানায় এবং অপর পক্ষ আদালতে মামলা করেছে। পুরো বিষয়টি বর্তমানে পুলিশ তদন্ত করে দেখছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

