চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড উপকূলকে ব্যবহার করে সমুদ্রপথে ইউরিয়া সার পাচারের ধারাবাহিক তৎপরতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রথমে ট্রাকে করে উপকূলীয় ঘাটে সার আনা হয় এবং পরে মাছ ধরার ট্রলার কিংবা কার্গো বোটে তুলে তা সমুদ্রপথে পাচারের চেষ্টা চালানো হয়।
গত দুই মাসে কোস্ট গার্ড ও পুলিশের পাঁচটি পৃথক অভিযানে ২ হাজার ৯৭১ বস্তা বা ১৪৮ দশমিক ৫৫ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়েছে। সর্বশেষ শনিবার (৩১ অক্টোবর) ভোরে মিরসরাইয়ের ইছাখালীতে দুটি ট্রাকসহ ৩০১ বস্তা সার জব্দ করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় আটজনকে আটক করা হয়েছে।
বারবার বড় বড় চালান জব্দ হলেও সার পাচারের সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব না হওয়ায় সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া ইউরিয়া সার মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পৌঁছাচ্ছে এবং এর বিনিময়ে বাংলাদেশে অবৈধ মাদক ও অস্ত্র আসছে বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
জোরারগঞ্জ থানার পুলিশ জানায়, শনিবার ভোররাত সাড়ে ৪টার দিকে উপজেলার ইছাখালী ইউনিয়নের মুহুরী প্রজেক্টের ৪০ নম্বর গেট এলাকায় অভিযান চালিয়ে সারবোঝাই দুটি ডাম্পট্রাক আটক করা হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এসআই মো. মতিউর রহমান সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে এ অভিযান পরিচালনা করেন। দুটি ট্রাকে ৫০ কেজি ওজনের মোট ৩০১ বস্তা ইউরিয়া সার পাওয়া যায়, যার ডিলার মূল্য ৩ লাখ ৭৬ হাজার ২৫০ টাকা। এ সময় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটজনকে থানায় নেওয়া হয়। জব্দ করা ট্রাক ও সার বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে এবং ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন ও মূল হোতাদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।
জোরারগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ আব্দুল হালিম জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশের একাধিক দল প্রায় চার ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে দুটি ট্রাকসহ ৩০১ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে। এ ঘটনায় আটজনকে আটক করা হয়েছে এবং পাচারচক্রের সঙ্গে আরও কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর মিরসরাইয়ের ইছাখালী ঘাটসংলগ্ন এলাকায় কোস্ট গার্ড অভিযান চালিয়ে চারটি ট্রাক ও একটি মাছ ধরার নৌযানসহ ৯৬০ বস্তা বা ৪৮ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার জব্দ করে। ট্রাক থেকে মাছ ধরার নৌযানে সার স্থানান্তরের সময় তিনজনকে আটক করা হয়।
কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, জব্দ করা সারের আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল ৩৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে সার নিলামে বিক্রি করা হলেও ট্রাকগুলো এখনো উপজেলা প্রশাসনের হেফাজতে রয়েছে।
তার আগের দিন ২৩ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ঘাটসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৬০০ বস্তা বা ৩০ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্ট গার্ড। ট্রাক থেকে কার্গো বোটে সার স্থানান্তরের সময় দুটি ট্রাকসহ দুজনকে আটক করা হয়। জব্দ করা সারের আনুমানিক মূল্য ছিল ২১ লাখ টাকা।
এরও আগে ১০ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ঘাট এলাকায় তিনটি ট্রাক থেকে ৭০০ বস্তা বা ৩৫ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় দুটি ট্রাকসহ দুজনকে আটক করা হয় এবং জব্দ করা সারের আনুমানিক দাম ছিল ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
এছাড়া ১ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড ঘাটে অভিযান চালিয়ে একটি কার্গো বোট থেকে ৪১০ বস্তা বা ২০ দশমিক ৫ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্ট গার্ড। ওই চালানের আনুমানিক দাম ছিল ১৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। তবে অভিযানের সময় পাচারকারীরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
গত দুই মাসের এই পাঁচটি অভিযান পর্যালোচনা করলে সার পাচারের একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল সামনে আসে। প্রথমে ট্রাকে করে সার দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উপকূলীয় ঘাটে আনা হয় এবং পরে তা মাছ ধরার ট্রলার বা কার্গো বোটে স্থানান্তর করে সমুদ্রপথে পাচার করা হয়। মিরসরাইয়ের ইছাখালী এবং সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ও বাড়বকুণ্ড ঘাটকে কেন্দ্র করে এসব তৎপরতা চললেও এই পাঁচটি ঘটনার সঙ্গে একই সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত কি না, তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


