চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বাহলুল মজনু বিপ্লবের বেড়ে ওঠা কালাপানিয়া ইউনিয়নের কমর আলী হাজী বাড়িতে। শৈশব কেটেছে সাগরপাড়ে। অথচ তার স্বপ্ন ঠেকেছে বরফে ঢাকা দুর্গম পর্বতের চূড়ায়।
পেশায় ফার্মেসি ব্যবসায়ী হলেও সুযোগ পেলেই তিনি ছুটে যান পাহাড়ের টানে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অংশ নিয়েছেন ১৪টি ক্লাইম্বিং ও একটি ট্রেকিং অভিযানে। এর মধ্যে নয়টি ক্লাইম্বিং অভিযানে সফলভাবে চূড়া স্পর্শ করেছেন।
দুর্গম পাহাড়ে কেন এই ছুটে চলা—এমন প্রশ্নের জবাবে বিপ্লব বলেন, নিজেকে খুঁজে পেতে পাহাড়ে পাহাড়ে ছুটে বেড়াই। দীর্ঘ পরিশ্রমের পর কোনো পর্বতের চূড়ায় যখন উঠি, তখন নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করি। প্রতিটি অভিযানের পরতে পরতে মৃত্যুভয় ও রোমাঞ্চ।
২০১০ সালে নেপালের ২০ হাজার ৫২৮ ফুট উচ্চতার ‘চেকিগো’ নামের একটি অবিজিত পর্বত জয়ের অভিযানে তিনি অংশ নেন। সাত সদস্যের ওই দলে নেপাল ও বাংলাদেশের পর্বতারোহীরা ছিলেন। সিদ্ধান্ত ছিল, যৌথভাবে চূড়াটি জয় করতে পারলে এর নাম রাখা হবে ‘নেপাল-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পিক’। এর আগে কয়েকটি দেশের পর্বতারোহী চেষ্টা করেও চূড়াটিতে পৌঁছাতে পারেননি।
মৃত্যুঝুঁকি জেনেও অভিযানে অংশ নেন বিপ্লব। ওঠার পথে দড়ি না থাকায় প্রায় ৮০ ডিগ্রি খাড়া বরফের ঢাল থেকে নিচে পড়ে যেতে থাকেন তিনি। নিচে ছিল হাজার হাজার ফুট গভীর খাদ।
সেই ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বিপ্লব বলেন, এত দ্রুত পড়ছিলাম যে কোনো কিছুতেই নিজেকে আটকাতে পারছিলাম না। স্নো-পাউডার হওয়ায় হাতের আইস এক্স (কুঠার সদৃশ বস্তু) দিয়েও বরফ আঁকড়ে ধরা যাচ্ছিল না। আর কয়েক সেকেন্ড, তারপরই হয়তো সব শেষ! লাশটাও হয়তো কেউ খুঁজে পেত না। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ আমার হাতের আইস এক্স শক্ত বরফে আটকে যায়।
মৃত্যুকে জয় করে শেষ পর্যন্ত চূড়ায় পৌঁছান তিনি। এ অর্জনের বিষয়ে বিপ্লব বলেন, ভবিষ্যতে যত উঁচু পর্বতেই যাই না কেন, আমি সবসময় গর্ববোধ করব যে বাংলাদেশের নামে একটি পর্বতের নামকরণের পেছনে আমারো অবদান আছে।
পর্বতারোহণের নিয়ম সম্পর্কে বিপ্লব বলেন, পাহাড়ের চূড়ায় সবসময় দুপুর ১১টা বা ১২টার পর থেকে আবহাওয়া খারাপ হতে থাকে। তাই আমাদের সবসময় সকাল ১০টার মধ্যে সামিট (চূড়ায় ওঠা) করতে হয়। ২০০৮ সালে ভারতের পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণে আমাদের শেখানো হয়েছিল—আবহাওয়া খারাপ হলে কোনোভাবেই উপরে ওঠা যাবে না, নিচে নেমে আসতে হবে। উপরে ওঠা মানে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঝুঁকে পড়া।
তিনি জানান, পাহাড়ের বিরূপ আবহাওয়ায় অক্সিজেনের মাত্রা কমে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, চারপাশ অন্ধকার হয়ে পথ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। অতিরিক্ত ঠান্ডায় ‘ফ্রস্টবাইট’ হয়ে হাত, পা, কান বা নাকের কোষ মরে যেতে পারে। মাত্রাতিরিক্ত হলে অঙ্গ কেটে ফেলতেও হয়। এমনকি ফুসফুস ও মস্তিষ্কে পানি জমে পর্বতারোহীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এসব প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই তিনি বারবার অভিযানে বের হন।
বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের (বিএমটিসি) নিয়মিত সদস্য বিপ্লবের অভিযান শুরু হয় ২০০৯ সালে ভারতের ২০ হাজার ১৯০ ফুট উচ্চতার ‘স্টক কাং রি’ আরোহণের মাধ্যমে। এরপর তিনি নেপালের লবুজে, ইমজা সে (আইল্যান্ড পিক), কেয়াজো রি, মেরা পিক, লারকে, ফার্চামো, দোগারি হিমাল এবং ডোলামা খাংসহ ছয় হাজার মিটারের একাধিক দুর্গম চূড়ায় আরোহণ করেছেন।
২০১৮ সালে চীনের তিব্বত অংশে অবস্থিত ২৩ হাজার ১১৩ ফুট উচ্চতার ‘লাকপা রি’ (সাত হাজার মিটারের পর্বত) শৃঙ্গ জয় তার অন্যতম বড় অর্জন। সর্বশেষ ২০২৪ সালে তিনি নেপালের আইল্যান্ড পিক ক্লাইম্বিং এবং অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্প ট্রেকিং সফলভাবে সম্পন্ন করেন।
পর্বতারোহণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি কাজ। এ বিষয়ে বিপ্লব বলেন, এই বিশাল অর্থের যোগানে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। পরিবার এবং বন্ধুদের সহযোগিতাও ছিল। আবার নিজের অর্থে অভিযানে গিয়েছি এমনও আছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিপ্লব বলেন, আমার লক্ষ্য উঁচু থেকে আরো উঁচুতে যাওয়া, আর সেটা হলো এভারেস্ট। এখন এভারেস্ট যাওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করছি। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী ২০২৭ সালের এপ্রিল-মে মাসে এভারেস্ট যাওয়ার ইচ্ছা আছে।
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

