ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে দখল ও দূষণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে তিতাস নদী ও এর শাখা হিসেবে পরিচিত বুড়ি নদী। বিএস রেকর্ডের দোহাই দিয়ে নদীর পূর্ব পাশে প্রায় ৪০০ ফুট প্রস্থের বিস্তীর্ণ এলাকা বালু দিয়ে ভরাট করে দখলের অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি নবীনগর সদর বাজারের ময়লা-আবর্জনা নিয়মিত নদীতে ফেলার কারণে দূষণ ও নাব্যতা সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নবীনগর পৌরসভার পাশ দিয়ে প্রবাহিত তিতাস ও বুড়ি নদীর তীরে বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমে আছে। বিশেষ করে পৌরসদরের লঞ্চঘাট, থানার নৌকাঘাট, মনুবাবুর ঘাটলা ও স্পিডবোট ঘাটের সামনে নদীর পাড়ে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য পড়ে রয়েছে। এসব বর্জ্য পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে পথচারী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং হাটের দিনে নদীর পাড়ে বসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চরম দুর্ভোগে পড়ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর পাড়ে দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য ফেলার কারণে একদিকে নদী ভরাট হচ্ছে, অন্যদিকে সেই সুযোগে পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠছে নতুন নতুন অবৈধ স্থাপনা। এতে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ছে নদীর প্রবাহপথ।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, এক শ্রেণির অসাধু ভূমি কর্মকর্তার সহযোগিতায় সিএস রেকর্ড পরিবর্তন করে বিএস রেকর্ডে নদীর জায়গা ব্যক্তিমালিকানায় দেখানো হয়েছে। তাদের দাবি, সিএস ম্যাপে যেখানে নদীর প্রস্থ ৬২০ ফুট, সেখানে বিএস ম্যাপে তা ২২০ ফুট দেখানো হয়েছে। পরে নদীর বড় একটি অংশ বালু দিয়ে ভরাট করে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।
২০১৪ সাল থেকে নবীনগর পূর্ব ইউনিয়নের বগডহর মৌজার কৃষিজমি ও তিতাস-বুড়ি নদীর জায়গা নিজের মালিকানা দাবি করে ভরাটের কাজ শুরু করেন ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর কয়েক বছর ভরাট কার্যক্রম বন্ধ ছিল। তবে সম্প্রতি আবারও সেখানে বালু ভরাট শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
নবীনগর নৌকাঘাটের মাঝি আল আমিন, বিল্লাল মিয়াসহ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ছোটবেলা থেকেই তারা নদী দুটির সঙ্গে পরিচিত। এক দশক আগেও বর্ষাকালে নদীর বিস্তীর্ণ জলরাশি দেখা যেত। এখন নদীর চারপাশে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠছে। তাদের ভাষায়, ‘চারদিকে শুধু দখল আর দখল।’
তারা বলেন, একসময় নদীর তীরে দিন-রাত মানুষ আড্ডা দিত। এখন ময়লা-আবর্জনার পচা দুর্গন্ধে সেখানে দাঁড়ানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত নদীর পাড়ে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণের দাবি জানান তারা।
স্থানীয় প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও উচ্ছেদ করলেও দখল-দূষণ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। স্থানীয়দের মতে, নিয়মিত নজরদারি, ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি হচ্ছে না।
এ বিষয়ে নবীনগর পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম মুঠোফোনে ‘আমার দেশ’-কে বলেন, নবীনগর শহর এবং তিতাস ও বুড়ি নদীর তীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে ব্যবসায়ীদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, রাতের আঁধারে সদর বাজারের কিছু ময়লা-আবর্জনা নদীর তীরে ফেলা হচ্ছে। এতে পরিবেশ নষ্ট ও নদী দূষিত হচ্ছে। যেসব স্থানে ময়লা-আবর্জনা জমে আছে, সেগুলো দ্রুত পরিষ্কার করা হবে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দখল ও দূষণ বন্ধে কার্যকর ও স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া না হলে একসময় তিতাস ও বুড়ি নদীর অস্তিত্বই হারিয়ে যেতে পারে। তখন জীবন্ত নদী দুটির নাম হয়তো শুধু বইয়ের পাতাতেই টিকে থাকবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

