আত্মহত্যার আগে মা-বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে পুলিশ সদস্যের পোস্ট

আত্মহত্যার আগে মা-বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে পুলিশ সদস্যের পোস্ট
পুলিশ সদস্য সাইদুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর ডেমরা পুলিশ লাইনে বহুতল ভবনের একটি কক্ষ থেকে শুক্রবার ভোরে সাইদুল ইসলাম (২১) নামে এক তরুণ পুলিশ কনস্টেবলের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, পারিবারিক কলহ থেকে হতাশা এবং তারপর গলায় ফাঁস নিয়ে মৃত্যু হয়েছে তার।

এদিকে মৃত্যুর পূর্বে এ প্রতিবেদন লেখার ১৬ ঘণ্টা আগে নিজের ফেসবুক আইডিতে সাইদুল লিখে গেছেন হতাশার কথা।

বিজ্ঞাপন

নিচে তার লেখা পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

“তোমায় কেন্দ্র করে আমি যে জগৎ সাজিয়ে গুছিয়ে গড়ে তুলেছিলাম একটু একটু করে, হঠাৎ যেন সে জগৎটাকে দুইদিনেই চোখের সামনে ভেঙেচুরে চুরমার করে দিলে। আমি সবকিছু চুপচাপ দেখে গেলাম। সমুদ্রের মাঝখানে তরী ডোবা মানুষ অনেকক্ষণ সাঁতার কাটার পর যেমন কুলের দেখা না পেয়ে শেষমেষ নিয়তিকে মেনে নেয়, সদরে গ্রহণ করে মৃত্যুকে, তেমনি আমারও যেন কিছুই করার নেই।

কত তুচ্ছ বাহানা দিয়ে মানুষ একটা গভীরতম সম্পর্কের ইতি টানে, আমি অবাক হই, মানুষ আসলেই কী মানুষকে ভালোবাসে..?

জানো.? মাঝে মাঝে কেন জানি নিজেরে দেখলে

নিজের অনেক মায়া লাগে, হাহাকার লাগে কি হয়ে গেলাম কি বানাইয়া গেলা, আচ্ছা বলতো আমার দোষটা কি ছিল.? কি করছিলাম আমি.? তোমারে ভালোবাসাটা অপরাধ.? নাকি সব কিছু উপেক্ষা করে তোমাকে বিয়ে করাটা অপরাধ.?

তুমি না বলছিলা মৃত্যু ছাড়া তুমি কখনোই আমাকে ছেড়ে যাবে না.? এখন কই তুমি? আমিতো তোমার অভাবেই শেষ হয়ে গেলাম, অনেকবারই তো আঘাত করছো সব ভুলে বার বার মাপ করে তোমাকে বুকে টেনে নিলাম এই মূল্য দিলা.? একেবারেই শেষ করে দিতে আসলা? আমি তো নিয়তি মেনে নিয়ে দূরেই ছিলাম তোমার থেকে কেন আবার আসছিলা কেন এত কাছে আসচিলা? কোন উত্তর খুঁজে পাইনা আমি।

শুধু দ্বিতীয় বার না

তৃতীয় বার না

চতুর্থ বার না

আমি হাজার বার সুযোগ দিয়েছি

কিন্তু তুমি প্রতিবার'ই আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছো

মানুষকে এতটাও বিশ্বাস করতে হয়না যে বিশ্বাস করলে নিজেই আর বাঁচার সুযোগ থাকেনা।

হারিয়ে ফেলতে চাইনি বলেই আমাদের সম্পর্কের নাম দিয়েছি স্বামী-স্ত্রী। যদি তোমাকে হারানোর ইচ্ছে থাকত, যদি এই ভালোবাসা ক্ষণিকের মোহ হতো তবে কখনোই এত পবিত্র এক বন্ধনের নামে তোমাকে নিজের বলে ঘোষণা করতাম না। কখনোই তোমাকে নিজের নামে লিখিত করতাম না। আমার কাছে এই সম্পর্ক কোনো সাময়িক অনুভূতি নয় এটি আজীবনের অঙ্গীকার, বিশ্বস্ততা আর একে অপরকে পাশে থাকার নীরব শপথ ছিল কিন্তু তুমি সব শেষ করে দিলা।

আচ্ছা যদি যাওয়ারই ছিল আসছিলাই কেন.?

বহুকাল বয়ে বেড়াতে হবে হৃদয় ভাঙ্গা এই ব্যথা, হয়ত এই জন্মে আর সেরে উঠবে না মৃত্যু ছাড়া,।

তাই আমি সেই পথেই গেলাম।

সারা জীবন মানুষের" বুঝাইলাম অথচ

দিন শেষ এসে দেখি আমি নিজেই

অবুঝ..!

যাও ভালো থালো যতটুকু দূরত্ব নিয়ে তুমি চলে গেলে তার থেকে দ্বিগুণ দূরত্ব নিয়ে আমি হারিয়ে গেলাম সুখে থাকো এটাই কামনা। তোমাকে বলেছিলাম না এটাই আমার শেষ শক্তি হয়তো তুমি, নয়তো আমি শেষ।নাও তারও প্রমাণ দিলাম সারা জীবন তো প্রমাণই দিয়ে আসলাম তারপরও।

যাই হোক।

তুমি তো জানোই চাইলে আমি অনেক কিছুই করতে পারতাম কিন্তু আমার প্রতিপক্ষ তো তুমি হয়ে গেলা কি আর করব,

যাও প্রমাণ সব তোমার অনুকূলে কারণ আমার পক্ষের উকিল হচ্ছে এমন নীরবতা আমার নীরবে হারিয়ে যাওয়া, যেখানে তুমি জবানবন্দি দিলে আর তুমি দিলে বিচ্ছেদের চূড়ান্ত রায়।

দুঃখিত আম্মু আব্বু আপনাদের ছেলে আর নিতে পারতেচেনা আম্মু আর পারতেচেনা আর তিলে তিলে মরার শক্তি আমার নাই। মাপ করবেন আপনাদের অযোগ্য ছেলেকে। আমার যেন আর কিছুই করার নাই।।

একদম ভেঙে চুরে শেষ হয়ে গেলাম।”

ফেসবুক পোস্টের পাশাপাশি তিনি একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন। যেখানে শুরুতেই লেখা ভেসে ওঠে ‘দ্য ইন্ড’।

প্রসঙ্গত, শুক্রবার (১৭ জুলাই) ভোর ৫টার দিকে অচেতন অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

​নিহত সাইদুল ইসলাম ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়া উত্তর চাঁদপুর গ্রামের মো. সাদেকের ছেলে। তার পুলিশ বিপি নম্বর: ০৭২৬২৬৬৪৬৫। তিনি ডেমরা পুলিশ লাইনের ২০ তলা ভবনের নবম তলার একটি কক্ষে থাকতেন। মাত্র ৯ মাস আগে তিনি পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরিতে যোগদান করেছিলেন।

হাসপাতালে সাইদুলের চাচা মো. সোহাগ জানান, পারিবারিক কলহের জেরে সাইদুল কিছুদিন ধরে চরম বিষণ্নতায় ভুগছিলেন।বৃহস্পতিবার ওই ভবনের সপ্তম তলায় নিজের রুমে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে বিছানার চাদর পেঁচিয়ে সে গলায় ফাঁস দেন। ​পরে তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয় বলে চিকিৎসকরা জানান।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মোহাম্মদ ফারুক চিকিৎসকের বরাত দিয়ে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করা হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন