কক্সবাজার জেলায় অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। টানা ৯ দিনের ভারি বৃষ্টিপাতের পর দশম দিনে এসে বৃষ্টি কিছুটা কমেছে। এতে প্লাবিত এলাকার পানি কিছু নামতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে ভেসে উঠতে শুরু করেছে ক্ষতচিহ্ন। বৃষ্টিতে প্লাবিত এলাকার ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক বিবরণী সংগ্রহের কাজও শুরু করেছে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তথ্যমতে, গত ৪ জুলাই থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত ৯ দিনে কক্সবাজারে ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যার কারণে কক্সবাজার জেলার ৭১টি ইউনিয়ন ও ৫টি পৌরসভার মধ্যে ৭০টি ইউনিয়ন ও ৪টি পৌরসভার ৪৯ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি ছিল অন্তত আড়াই লাখ মানুষ।
ওই সময়ে পাহাড়ধস ও পানিতে ভেসে ১৩ রোহিঙ্গাসহ ৩০ জন নিহত, নিখোঁজ রয়েছেন একজন। এই ৯ দিনে ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ১৬১৩, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩০, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২০৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, চকরিয়ার ১০ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভার ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। যেখানে ছয় জন নিহত ও একজন নিখোঁজ হন। এই উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ৩০০, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক এবং ২০টি সেতু ও কালভার্ট।
মাতামুহুরি উপজেলার ৭ ইউনিয়ন ৮৫ শতাংশ প্লাবিত হয়ে নিহত হন একজন। এই উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ১৯০, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৯০ কিলোমিটার সড়ক এবং ২০টি সেতু ও কালভার্ট।
পেকুয়া উপজেলার ৭ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভার ৯৫ শতাংশ প্লাবিত হয়ে নিহত হন দুজন। এই উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ৪৫০, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৫, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৩০ কিলোমিটার সড়ক এবং ২টি সেতু ও কালভার্ট।
মহেশখালী উপজেলার ৮ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভার ৫০ শতাংশ প্লাবিত হয়ে নিহত হন একজন। এই উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ২০০, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১২০০ কিলোমিটার সড়ক এবং ২টি সেতু ও কালভার্ট।
কুতুবদিয়া উপজেলার ছয় ইউনিয়ন ৬৫ শতাংশ প্লাবিত হয়ে নিহত হন একজন। এই উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ২৫০, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৫টি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৯ কিলোমিটার সড়ক এবং ২টি সেতু ও কালভার্ট।
কক্সবাজার সদরের ৫ ইউনিয়নের ২৫ শতাংশ প্লাবিত হয়ে নিহত হন ৩ জন। এই উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ১৮, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২০ কিলোমিটার সড়ক এবং ৪টি সেতু ও কালভার্ট।
রামু উপজেলার ১১ ইউনিয়নের ৩৫ শতাংশ প্লাবিত হয়ে নিহত হন দুইজন। এই উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ২৫টি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫০ কিলোমিটার সড়ক এবং ৫টি সেতু ও কালভার্ট।
ঈদগাঁও উপজেলার ৫ ইউনিয়নের ৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এই উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ৩০টি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫ কিলোমিটার সড়ক।
উখিয়া উপজেলার ৫ ইউনিয়নের ২৫ শতাংশ প্লাবিত হয়েছে। যেখানে ১৩ রোহিঙ্গাসহ নিহত ১৪ জন। এই উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ৫০টি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬ কিলোমিটার সড়ক এবং ১২টি সেতু ও কালভার্ট।
টেকনাফ উপজেলার ৬ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভার ২৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। এই উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ১০০টি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫ কিলোমিটার সড়ক এবং ১৫টি সেতু ও কালভার্ট।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, ৯ দিনে জেলার ৬১৮টি আশ্রয় কেন্দ্রে এক হাজার ৫৮০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। প্লাবিত এলাকার মানুষদের ৭ হাজার ৭৯০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ২৯৮ মেট্রিক টন চাল ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ত্রাণের চাহিদা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ৩৮১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি সমতল বিপদসীমা অতিক্রম করায় বিভিন্ন এলাকায় মোট ৪৪টি স্থানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নে পুরুত্যাখালী পূর্বপাড়া এলাকায় ২৫ মিটার অংশে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গেছে।
কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল কুমার প্রামাণিক জানিয়েছেন, ৯ দিনে কৃষি ক্ষেত্রে ৪ হাজার ২১২ হেক্টর ফসল নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেখানে আউশ ধান রয়েছে ২ হাজার ৬২০ হেক্টর, আমন বীজতলা রয়েছে ৪৭০ হেক্টর, শাক-সবজি ক্ষেত রয়েছে ৯৯৫ হেক্টর ও পান বরজ আছে ১৬৬ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৪৩ হাজার ২১০ জন।
এদিকে কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, অতিবৃষ্টিজনিত বন্যায় জেলার ১০ উপজেলার ৬১টি ইউনিয়নের ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর ও ৪৫৩টি চিংড়িঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জলাশয়গুলোর মোট আয়তন প্রায় ২ হাজার ৪৪০ হেক্টর।
তিনি বলেন, এসব পুকুর ও ঘের থেকে এক হাজার ৯৭ মেট্রিক টন মাছ, ৩৮৫ মেট্রিক টন চিংড়ি, ৩ কোটি ৫৬ লাখ মাছের পোনা এবং ২ কোটি ২১ লাখ চিংড়ির পোনা নষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি ৭৬৮টি পুকুর, ঘের ও খামারের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে, বলেছেন নাজমুল হুদা।
অপরদিকে টানা নয়দিনের ভারী বর্ষণ ও বন্যায় কক্সবাজারে মোট ৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পেকুয়া ও কুতুবদিয়া উপজেলায়। এই দুই উপজেলায় ১৫টি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্য উপজেলাগুলোতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির কোনো তথ্য জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

