অচল হয়ে পড়ছে যানবাহন সেচ, শিল্পকারখানা

আমার দেশ ডেস্ক

অচল হয়ে পড়ছে যানবাহন সেচ, শিল্পকারখানা

সারা দেশে পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি তেল সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। এতে করে কৃষক, যানবাহনের চালক ও শিল্পকারখানার মালিকরা পেট্রোল পাম্পে প্রতিদিনই ভিড় জমিয়ে তুলছেন। তেল না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। অচল হয়ে পড়ছে যানবাহন সেচ ও শিল্পকারখানা।

সদরপুর (ফরিদপুর) প্রতিনিধি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সারা দেশের মতো ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় জ্বালানি তেল সংকট প্রকট হয়েছে। ডিজেলের অভাবে সেচ দিতে না পারায় কৃষকরা পড়েছেন সংকটে। প্রতিদিন তেলের খালি ড্রাম হাতে নিয়ে ডিজেলের সন্ধানে কৃষকরা ছুটছেন তেলের পাম্প ও হাটে বাজারের ডিলারদের কাছে। কিন্তু কোথাও মিলছে না চাহিদামাফিক ডিজেল। তাই পুরুষের পাশাপাশি ঘরের গৃহবধূরাও তেলের পাম্পে ভিড় করছেন ডিজেল সংগ্রহের আশায়।

বিজ্ঞাপন

গতকাল মঙ্গলবার সদরপুর ফিলিং স্টেশনে ডিজেল আসার খবরে ভোর থেকে হাতে ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি ও খালি বোতল হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কৃষকরা। পুরুষের পাশাপাশি অনেক নারীকেও দেখা যায় ডিজেল সংগ্রহের আশায় লাইনে দাঁড়াতে। লাইনে দাঁড়ানো ভাষানচর ইউনিয়নের গৃহবধূ রিনা জানান, সকাল ৮টায় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি এখন দুপুর ২টা বাজে। আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে জানি না। তিনি আরো বলেন, আমরা গরিব মানুষ। আমার স্বামী এলে তার একদিনের কামলা (কাজ) মাইর যাবে তাই আমি আসছি ডিজেল নিতে।

আকটের চর ইউনিয়ন থেকে আসা আরেক গৃহবধূ আয়েশা বেগম বলেন, আমার স্বামী জমিতে কাজ করে। সে আসতে পারে না বলেই আমি ভোরে এসেছি। ডিজেল নিতে না পারলে আমাদের বোরো ধানের ফলনই হবে না। স্বামী গতকাল (সোমবার) এসেছিল কিন্তু সে ডিজেল নিতে পারেনি। সারা দিন ঘুরে বাড়ি চলে গেছে। আমরা গরিব মানুষ। দিন কামাই গেলে আমরা খাব কী?

ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি জানান, ভালুকা উপজেলার ফিলিং স্টেশনগুলোয় চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল সরবরাহ নেই। সরবরাহ কমে যাওয়া জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তেল সংকটে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়েছে। অনেক পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে।

জানা যায়, উপজেলার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল ও অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল বা অকটেন দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে প্রাইভেট কার ও বাইক চালকরা ছুটে যান। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে ২০০ টাকার পেট্রোল বা অকটেন পাচ্ছেন না।

এতে করে একই বাইক চালক একবার পেট্রোল নিয়ে পুনরায় গিয়ে লাইনে দাঁড়ান। ফিলিং স্টেশনের তেল শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাইক চালকদের লাইন শেষ হচ্ছে না।

পলাশ ফিলিং স্টেশনের মালিক শাহাব উদ্দিন ফরাজি জানান, সরবরাহ ঘাটতি ও বৈশ্বিক আমদানির সমস্যার কারণে অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল ও অকটেন দেওয়া বন্ধ রয়েছে। তারা অগ্রিম টাকা দিয়ে ডিপো থেকে তেল আনতে পারছেন না। সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইকবাল হোসাইন জানান, সংকট ও মজুতদারি রোধে মাঠে স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছেন। ভালুকা উপজেলার শিল্পের মালিকদের অভিযোগ এই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে কল-কারখানাগুলো বড় ধরনের উৎপাদন সংকটের মুখে পড়বে।

সদরপুর ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমরা যতটুকু ডিজেল পাচ্ছি তার সবটুকুই কৃষকদের দিচ্ছি। চাহিদার তুলনায় ডিপো থেকে সরবরাহ কম থাকায় আমাদের পরিস্থিতি সামাল দিতে কষ্ট হচ্ছে। পুলিশ দিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না।

শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, শরীয়তপুরে জ্বালানি তেলের দীর্ঘদিনের সংকট ও অব্যবস্থাপনা মোকাবিলায় নতুন উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করা ও অবৈধ মজুত ঠেকাতে কৃষক ও যানবাহনের জন্য আলাদা দুটি অ্যাপ চালু করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ডিজিটাল ব্যবস্থার ফলে জ্বালানি সরবরাহে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে।

শনিবার বিকালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অ্যাপ দুটির কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। কৃষি বিভাগ ও ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা অ্যাপ ব্যবহার করে নিবন্ধিত কৃষক ও যানবাহনের তথ্য যাচাই করে জ্বালানি তেল সরবরাহ করছেন। এতে করে প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী তেল পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফিলিং স্টেশনের সহ-ব্যবস্থাপক আলমগীর হোসেন বলেন, সরবরাহের ঘাটতির কারণে এতদিন চাহিদা অনুযায়ী তেল দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এতে কৃষক ও চালকদের অসন্তোষের মুখে পড়তে হয়েছে। এখন অ্যাপের মাধ্যমে যাচাই করে তেল দেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে।

জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, জ্বালানি তেল যাতে সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছায় এবং কেউ যেন অতিরিক্ত মজুত করতে না পারে, সে লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষক ও যানবাহনের জন্য পৃথক দুটি অ্যাপ চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিদিনের সরবরাহ ও বিতরণের তথ্য সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে।

বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি জানান, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব দেশের কৃষি খাতেও পড়তে শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে কৃষকদের জন্য আনা ডিজেল তেল বিতরণকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি।

উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ড. ইলিয়াস মোল্যা ও সাবেক সংসদ সদস্য খন্দোকার নাসিরুল ইসলাম নাসিরের সহযোগিতায় মেঘনা ডিপো থেকে কৃষি কাজের জন্য ডিজেল সংগ্রহ করা হয়। সোমবার রাতে ওই তেল বোয়ালমারী উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন পরিষদ ও একটি পৌরসভায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিতরণের উদ্দেশ্যে আনা হয়। প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য প্রায় দুই হাজার লিটার করে ডিজেল বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা কার্ডধারী প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বিতরণের কথা রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন