হাতে অস্ত্র নয়, কিবোর্ড। প্রতিবাদের মঞ্চ রাজপথ নয় এটি একটি ওয়েবসাইট। মাত্র ১৭ বছর বয়সে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর তরুণ শাহেদ শরীফ আহমেদের তৈরি ‘ঘুষ.সাইট’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চমক সৃষ্টি করেছে। সাইটটি চালুর মাত্র ১২ দিনের মধ্যেই এতে জমা পড়েছে ১২ হাজার ২০২টি ঘুষের অভিযোগ।
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্যমতে, এসব ঘটনায় দাবিকৃত ঘুষের মোট পরিমাণ প্রায় ৩৬১ কোটি ২৭ লাখ টাকা।
গত ২১ আগস্ট ‘ঘুষ.সাইট’ চালুর পর তা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ দাবির শিকার হওয়া ব্যক্তিরা এতে তাদের অভিযোগ জমা দিচ্ছেন। হাজার হাজার মানুষের এমন তথ্য প্রকাশের পর এখন প্রশ্ন উঠেছে—এসব অভিযোগ কি কেবল একটি ওয়েবসাইটের তথ্যাবলি হয়েই থাকবে, নাকি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সত্যতা যাচাই করে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে?
শাহেদ শরীফ আহমেদ কটিয়াদী পৌরসভার পূর্বপাড়া মহল্লার শরিফুল ইসলাম শামীমের ছেলে। মায়ের চাকরির সুবাদে ময়মনসিংহে বেড়ে ওঠা শাহেদ বর্তমানে বাবার সঙ্গে ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বসবাস করছেন। ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীন কেমব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্টের কাজ করছেন।
শাহেদের পরিবার জানায়, ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর অসুস্থজনিত কারণে তার মা আমিনা খাতুন মারা যান, যিনি ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। মৃত্যুর পর মায়ের সরকারি পাওনা টাকা তুলতে গিয়ে চরম ভোগান্তি ও ঘুষের মুখোমুখি হন শাহেদের বাবা শরিফুল ইসলাম শামীম।
অভিযোগ মতে, সাত লাখ টাকার প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ তুলতে ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে আট হাজার টাকা—মোট ৩৮ হাজার টাকা বাধ্য হয়ে ঘুষ দিতে হয়। এ ছাড়া কল্যাণ তহবিলের দুই লাখ ও মৃত্যুর আনুতোষিক বাবদ প্রাপ্য আট লাখ টাকা (মোট ১০ লাখ) তুলতেও আরও এক লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছে, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ৮০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ও-লেভেল পরীক্ষার জন্য শাহেদ নিজের পাসপোর্ট করাতে গেলে ফাইল আটকে রেখে দেড় হাজার টাকা ঘুষ নেওয়া হয়।
নিজের ও পরিবারের এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই ঘুষের বিরুদ্ধে ডিজিটাল প্রতিবাদ গড়ে তুলতে ‘ঘুষ.সাইট’ তৈরির সিদ্ধান্ত নেন শাহেদ। মাত্র দুই ঘণ্টায় সাইটটির প্রাথমিক কোডিং ও কাঠামো তৈরি করেন তিনি। পরবর্তীতে বন্ধু ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবিরের সহযোগিতায় ডোমেইন কিনে গত ২১ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সাইটটি চালু করা হয়।
ওয়েবসাইটের কারিগরি দিক শাহেদ নিজে দেখছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার ও বিপণনের কাজটি করছেন সাইফ কবির। এ ছাড়া প্রাপ্ত অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য তাদের চার সদস্যের একটি মডারেশন টিম রয়েছে। পুরো প্রকল্পে তাঁদের খরচ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা।
শাহেদ বলেন, আমি বর্তমানে হুমকির মুখে আছি এবং শারীরিকভাবেও কিছুটা অসুস্থ। তাই এ নিয়ে বেশি কথা বলতে পারছি না।
শাহেদের বাবা শরিফুল ইসলাম বলেন, স্ত্রীর মৃত্যুর পর পাওনা টাকা তুলতে বাধ্য হয়ে ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দিয়েছি। বাকি টাকা পাওয়ার জন্যও এক লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে। এসব অন্যায়ের প্রতিবাদেই আমার ছেলে এই ওয়েবসাইট তৈরি করেছে। বর্তমানে আমি আমার ছেলে ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন এবং সরকারের কাছে নিরাপত্তা দাবি করছি।
১৭ বছর বয়সী এক তরুণের ব্যক্তিগত উদ্যোগে চালু করা এই প্ল্যাটফর্মে ১২ দিনে হাজার হাজার অভিযোগ জমা পড়ার বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সচেতন মহল প্রশ্ন তুলছেন—অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী পদক্ষেপ নেবে?
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

