কোচিংয়ের বকেয়া ফি পরিশোধ না করায় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের ২১ শিক্ষার্থীকে প্রায় এক ঘণ্টা প্রধান শিক্ষকের কক্ষে দাঁড় করিয়ে রাখার অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে ১৫ জন ছাত্র ও ৬ জন ছাত্রী। এ ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবকেরা।
ঘটনাটি ঘটেছে সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদী নতুন মহল্লা এলাকার পিএম একাডেমি সংলগ্ন আল বালাগ স্কুলে।
বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, গত সোমবার ৮২ শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে ১৫ জন ছাত্র ও ৬ জন ছাত্রীকে প্রধান শিক্ষক ফারুক হোসেন তাঁর কক্ষে ডেকে পাঠান। তাঁদের কাছে কোচিংয়ের বকেয়া ফি দাবি করা হয়। শিক্ষার্থীরা জানায়, বিদ্যালয়ে কোচিং ফি হিসেবে শিক্ষার্থীপ্রতি এক হাজার টাকা নেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, এ সময় তারা পরিবারের আর্থিক সমস্যার কথা জানিয়ে অভিভাবকদের কাছ থেকে টাকা এনে দেওয়ার জন্য সময় চায়। কেউ কেউ পরে বকেয়া টাকা পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতিও দেয়। এরপরও তাদের প্রায় এক ঘণ্টা প্রধান শিক্ষকের কক্ষে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক বলেন, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে অস্বস্তি ও নার্ভাস অবস্থায় দেখা যায়। পরে বিষয়টি বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, ‘আমি প্রধান শিক্ষকের কাছে বকেয়া টাকা একসঙ্গে পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। এরপরও আমার মেয়েকে তাঁর কক্ষে নিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। গত দুই দিন ধরে ঠিকমতো খাচ্ছে না, স্বাভাবিক আচরণও করছে না।’
আরেক অভিভাবক বলেন, ‘কোচিংয়ের টাকা না দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের এভাবে শাস্তি দেওয়ার ঘটনা আগে কখনো শুনিনি। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। কিন্তু সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেকেই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে চাইছেন না।’
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে কোচিং কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তবে এবার বকেয়া কোচিং ফি আদায়ে শিক্ষার্থীদের এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখার ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
অভিভাবকেরা জানান, বিদ্যালয়ের আর্থিক বিষয়ে কোনো সমস্যা থাকলে তা অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করা উচিত। শিক্ষার্থীদের কেন এর দায় নিতে হবে—এমন প্রশ্নও তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ভবিষ্যতে যেন কোনো শিক্ষার্থীকে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, কোনো শিক্ষার্থীর বকেয়া ফি থাকলে তা অভিভাবকের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করা উচিত। অর্থনৈতিক কারণে শিক্ষার্থীদের প্রকাশ্যে অপমান বা মানসিক চাপে ফেলা হলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় এ ধরনের ঘটনা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।
অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফারুক হোসেন বলেন, ‘এটি একটি বেসরকারি স্কুল। আমরা স্কুলের মালিকদের পরামর্শে তাঁদের আমার কক্ষে আসতে বলি কোচিং ফি আদায় করার জন্য।’ কোচিং নিষিদ্ধ কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সিদ্ধিরগঞ্জের কোন স্কুলে কোচিং হয় না?’
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কোচিং ফি দিতে না পারায় প্রধান শিক্ষকের কক্ষে দাঁড় করিয়ে রাখার অভিযোগটি আমি মাত্রই শুনেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের মানসিক চাপ বা অপমানের মুখে ফেলা হয়ে থাকলে তা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।’
ইউএনও আরও বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কীভাবে ফি নেওয়া হচ্ছে এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বা বিধিমালা কী রয়েছে, সেটিও যাচাই করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

