ভারতের সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক ইতিহাসে যুবসমাজ বরাবরই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আর এখনো সেই প্রশ্নেরই কেন্দ্রে রয়েছে বর্তমান জেন-জি জেনারেশন। ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া এই প্রজন্ম আজ ভারতের জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৩৭ কোটি। পৃথিবীর সব জেন-জি জেনারেশনই প্রযুক্তিতে দক্ষ, তথ্যসচেতন, সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় এবং বৈশ্বিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। দুর্নীতি, বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার—কোনো কিছুই তাদের অজানা নয়। তবু ভারতের এই বিশাল যুবশক্তির রাজপথে দীর্ঘ অনুপস্থিতি অতীতে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামে তরুণেরা রাষ্ট্রীয় দমনকে উপেক্ষা করে জীবন বাজি রেখেছিলেন। সত্তরের দশকে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে যে গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তার চালিকাশক্তি ছিল যুবসমাজ। দুই হাজার দশকের শুরুতে আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০১২ সালের দিল্লি গণধর্ষণের পর দেশজুড়ে বিস্ফোরিত প্রতিবাদ—সবখানেই তরুণরাই ছিল অগ্রভাগে।
২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী আন্দোলনে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আবারও প্রতিবাদের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, কিংবা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে জেন-জির সক্রিয় অংশগ্রহণ স্পষ্ট করে দেয়—এই প্রজন্ম নীরব বা অসচেতন নয়। কিন্তু পুলিশি দমন, রাষ্ট্রবিরোধী তকমা এবং ছাত্রনেতাদের দীর্ঘ কারাবাস সেই আন্দোলনের স্বাভাবিক বিকাশ থামিয়ে দেয়। এখান থেকে শুরু হয় নীরবতার এক দীর্ঘ পর্ব।
এই নীরবতার পেছনে কয়েকটি বড় কারণও রয়েছে, তবে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত কারণ হলো ভারতের ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থা। ২৮টি রাজ্য ও আটটি ইউনিয়ন টেরিটরি নিয়ে গঠিত এই রাষ্ট্র কেবল প্রশাসনিকভাবে নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবেও বিভক্ত। সংবিধানে স্বীকৃত ২২টি ভাষা এবং কয়েক শত কথ্য ভাষা ভারতের বৈচিত্র্যের প্রতীক হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বৈচিত্র্য জাতীয় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
প্রতিটি রাজ্যে ক্ষোভ বা বিদ্রোহ আছে, কিন্তু সেই ক্ষোভ বা বিদ্রোহের ভাষা, লক্ষ্য ও শত্রু আলাদা। অন্ধ্রপ্রদেশে ভূমি অধিকার ও ল্যান্ড টাইটলিং আইন কৃষকদের উদ্বিগ্ন করছে। আসামে এসটি স্ট্যাটাস ও অভিবাসন প্রশ্ন সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। মণিপুরে জাতিগত সংঘর্ষ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণহীনতার নগ্ন উদাহরণ। মহারাষ্ট্রে মারাঠা কোটা, তামিলনাড়ুতে হিন্দি আরোপ, পাঞ্জাবে কৃষক ও বিদ্যুৎ সংকট, উত্তরপ্রদেশে ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ আইন—সব আন্দোলন বা ক্ষোভ একে অন্যের সঙ্গে কিন্তু যুক্ত নয়, বরং বিচ্ছিন্ন বিস্ফোরণের মতো।
এই বিচ্ছিন্নতাই ভারতের যুবসমাজকে জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিতে দেয় না। ক্ষোভ আছে, কিন্তু তা স্থানীয় গণ্ডিতেই আবদ্ধ। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজন। হিন্দু সমাজের ভেতরের জাতিপ্রথা, দলিত নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা—এসব কেবল সামাজিক সংকটই নয়, বরং রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির অস্ত্রও বটে। পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি যুবকদের শ্রেণিভিত্তিক বা নাগরিক ঐক্যের পরিবর্তে ধর্ম ও জাতিতে বিভক্ত করে রেখেছে।
ভারতীয় জেন-জির দীর্ঘ নীরবতার আরেকটি অনস্বীকার্য কারণ হচ্ছে ভয়। রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা, ইউএপিএ, ডিজিটাল নজরদারি এবং ক্যাম্পাসে প্রতিবাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা যুবকদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একসময় রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্র ছিল, আজ সেগুলো নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক স্পেসে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। বেকারত্ব, চুক্তিভিত্তিক কাজ এবং বিদেশমুখিতা—এই বাস্তবতা যুবকদের ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহিত করছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে ১৮ বছর বয়সি নতুন ভোটারের মাত্র ৩৮ শতাংশ নিবন্ধিত হয়েছে। প্রায় ৩০ শতাংশ তরুণ সরাসরি রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তবু প্রায় ৪০ শতাংশ যুবকের বিজেপির প্রতি সমর্থন দেখায়—ধর্মীয় পরিচয় এখনো তাদের রাজনৈতিক পছন্দকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। তবে এই নীরবতা চূড়ান্ত নয়। প্রত্যেক প্রজন্ম নিজস্ব সংকটে নিজস্ব ভাষায় জেগে ওঠে। ভারতের জেন-জি হয়তো এখনো সেভাবে রাজপথে নেই, কিন্তু তারা পরাজিতও নয়। তারা পর্যবেক্ষণ করছে, আলোচনা করছে, ডিজিটাল স্পেসে মত গড়ছে এবং সময়ের অপেক্ষায় আছে।
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—বিভক্ত শক্তি বিদ্রোহ করতে পারে, কিন্তু পরিবর্তন আনতে পারে না। যদি ভারতের যুবসমাজ এই বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একটি যৌথ নাগরিক চেতনা গড়ে তুলতে পারে, তবে এই নীরবতা একদিন বিস্ফোরণে রূপ নেবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

