আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

পিলখানা হত্যাকাণ্ড

মা ও স্ত্রীকে মেজর মাহবুব বলেছিলেন, ‘আবার দেখা হবে’

ধামরাই প্রতিনিধি, ঢাকা

মা ও স্ত্রীকে মেজর মাহবুব বলেছিলেন, ‘আবার দেখা হবে’

ঢাকার পিলখানা বিডিআর সদরদপ্তর-এ ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের আগে মাকে ও স্ত্রীকে শেষবারের মতো ফোন করে বলেছিলেন-“আবার দেখা হবে।” সেই কথাটিই আজও কানে বাজে শহীদ মেজর মাহবুবুর রহমানের (সোহেল) মা খোদেজা রহমানের।

বুধবার বিকেলে বিডিআর ট্র্যাজেডিতে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণে বরিশাল এক্স-ক্যাডেট’স অ্যাসোসিয়েশন ঢাকার ধামরাইয়ের পৌর এলাকায় এক হেলথ ক্যাম্পের আয়োজন করে।

বিজ্ঞাপন

ওই হেলথ ক্যাম্পে এক আলোচনা সভায় ছেলের স্মৃতি বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে শহীদ মেজর মাহবুবের মা খোদেজা রহমান ছেলের শেষ সময়ের স্মৃতিসহ নানা স্মৃতিচারণ করেন।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন শহীদ মেজর মাহবুবুর রহমান। বিডিআরে যোগদানের আগে সর্বশেষ শান্তিরক্ষী মিশনে ছিলেন তিনি। সেখান থেকে ফেরার পর তার তৎকালীন বিডিআরে পদায়ন হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে পর দিন যোগদান করতে বলা হয় তাকে। সেখানে গিয়েই দুপুরের দিকে সর্বশেষ মা ও স্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। এরপরই নিখোঁজ হন। দুই দিন পর তার মরদেহ পাওয়া যায়।

ছেলের স্মৃতিচারণ করে খোদেজা রহমান বলেন, ছোটবেলা থেকেই তার ছেলে আর্মি অফিসার হওয়ার স্বপ্ন বুকে ধারণ করেছিল।

খোদেজা রহমান জানান, তার সন্তানদের মধ্যে মাহবুব ছিল সবচেয়ে মেধাবী। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় অসাধারণ আগ্রহ ছিল তার। ক্লাস টু থেকেই সে নিয়মিত পড়াশোনা করত একটি লক্ষ্য নিয়ে-একদিন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হবে। পরিবারের একটি পুরনো শোকও তার স্বপ্নকে আরও দৃঢ় করে তোলে। তার দেবর মেজর সফুর রহমানের মৃত্যুর সময় পরিবারের সবাই যখন ভেঙে পড়েছিল, তখন ছোট্ট মাহবুব সবার উদ্দেশে বলেছিল, “ভয় পেয়ো না, আমিও মেজর হব, আমিও আর্মি অফিসার হব।”

তিনি বলেন, ছেলের ব্যক্তিত্ব ছোটবেলা থেকেই আলাদা ছিল। ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময়ও সে বড়দের বই উল্টেপাল্টে দেখত, শেখার চেষ্টা করত। একবার এক সেনা কর্মকর্তা তাদের বাড়িতে এসে গভীর রাতে দেখেন ছোট্ট মাহবুব পড়াশোনা করছে। বিষয়টি দেখে বিস্মিত হয়ে তিনি জানতে চাইলে মা বলেন, তার স্বপ্ন একজন আর্মি অফিসার হওয়া। তখন ওই কর্মকর্তা তাকে দোয়া করেছিলেন, যেন সে একদিন সফল হয়।

পরবর্তীতে পড়াশোনায় সাফল্যের ধারাবাহিকতায় সে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ার সুযোগও পেয়েছিল। কিন্তু নিজের স্বপ্ন থেকে সরে যায়নি। দেশের জন্য কাজ করার ইচ্ছা থেকেই সে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্বশীলতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সে তার কর্মজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিল।

ঘটনার দিন সম্পর্কে বলতে গিয়ে খোদেজা রহমান বলেন, ২৪ তারিখ রাতে একটি এসএমএসের মাধ্যমে তাকে পিলখানায় ডাকা হয়, যদিও সেদিন তার যাওয়ার কথা ছিল না। সকালে বের হওয়ার সময় তার স্ত্রীও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এত সকালে কেন যেতে হচ্ছে। সে বলেছিল, সবার সঙ্গে দেখা হবে। এরপর ড্রাইভারকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে নিজেই ভেতরে প্রবেশ করে।

এর কিছুক্ষণ পরই শুরু হয় গোলাগুলি। সেই সময় খোদেজা রহমান ছিলেন এসএসসি পরীক্ষার একটি কেন্দ্রে, দায়িত্ব পালন করছিলেন কেন্দ্র সচিব হিসেবে। হঠাৎ ছেলে ফোন করে জানতে চায়-তিনি কোথায় আছেন। তিনি বলেন, তিনি পরীক্ষার হলে আছেন। তখন ছেলে শুধু বলেছিল, “আচ্ছা, ভালো থাকেন। আবার দেখা হবে।” একই কথা সে তার স্ত্রীকেও বলেছিল। পরে মনে হয়েছে, হয়তো তখনই সে বুঝতে পেরেছিল ভেতরে কিছু একটা অস্বাভাবিক ঘটতে যাচ্ছে।

এরপর দুই দিন পর্যন্ত পরিবার কোনো খবর পায়নি। পরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু সেই মরদেহও পরিবারকে ভালোভাবে দেখতে দেওয়া হয়নি বলে জানান খোদেজা রহমান। সেই স্মৃতি মনে পড়লে এখনও তিনি ভেঙে পড়েন। তার কথায়, সন্তান হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না-এটা শুধু একজন মা-ই বুঝতে পারেন।

ছেলের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, তার মতো এমন দুঃখ যেন আর কোনো মায়ের জীবনে না আসে। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি আর কিছু বলতে পারছি না।”

এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ​প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বিশেষ অতিথি হিসেবে সংসদ সদস্য আলহাজ্ব তমিজউদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।

দিনব্যাপী এই ক্যাম্পে কয়েকশ মানুষকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ও ঔষধ দেওয়া হয়। এতে চিকিৎসা দেন শহীদ মেজর মাহবুবুর রহমানের সহপাঠী চিকিৎসকরা।

এর আগে, সকালে শহীদ সেনা দিবসের ১৭তম বার্ষিকীতে ধামরাইয়ে মেজর মাহবুব স্মরণে তার কবরস্থানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ সময় তার পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত থেকে কবরের সামনে দাঁড়িয়ে দোয়া ও মোনাজাত করেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন