নারায়ণগঞ্জে জেট এ-১ আন্ডারগ্রাউন্ড পাইপলাইন প্রকল্পে নতুন করে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো এ প্রকল্পে হস্তক্ষেপ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শহরের কাঞ্চন ব্রিজসংলগ্ন পিতলগঞ্জ থেকে কুর্মিটোলা অ্যাভিয়েশন ডিপো (কেএডি) পর্যন্ত চলমান এই প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে আটকে ছিল। প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন, পাম্পিং সুবিধা ও জেটিসহ টার্ন-কি নির্মাণের জন্য ২০১৭ সালের ৮ নভেম্বর নৌ কল্যাণ ফাউন্ডেশন ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেডের (এনকেএফটিসিএল) সঙ্গে চুক্তি হয়। এনকেএফটিসিএল নৌ কল্যাণ ফাউন্ডেশনের বাণিজ্যিক সহযোগী।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সূত্র জানায়, প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জন্য জেট এ-১ (অ্যাভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল) সরবরাহকে আরো সংহত করা। রোড ট্যাংকারের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি খরচ কমানো, চুরি-পাচার রোধ এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাই ছিল এই প্রকল্পের লক্ষ্য।
বিপিসি সূত্র অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির অনুমোদিত প্রাক্কলিত মূল্য ছিল ১৮৩ কোাটি ৭৭ লাখ টাকা। চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনকে (সিএমইসিসি) ও বারাকা ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডকে (বিইএল) জেভিকে একই বছরের ৯ নভেম্বর সাব কন্ট্রাক্টর হিসেবে নিয়োগ দিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করে এনকেএফটিসিএল।
প্রকল্পটির অন্তর্ভুক্ত পিতলগঞ্জ ডিপোর জন্য ৬ দশমিক ০১ একর জমি অধিগ্রহণ করে বিপিসি। চুক্তি স্বাক্ষরের ১৫ দিনের মধ্যে রাইট-অফ ওয়ে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও অনুমোদন পেতে এক বছরের বেশি সময় লাগে। পিতলগঞ্জ থেকে কুর্মিটোলা অ্যাভিয়েশন ডিপো পর্যন্ত মূল লাইনের রুট তিনবার পরিবর্তন করা হয়। ২০১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হলেও তিনটি এসভি স্টেশনের জায়গা নির্ধারিত হয়নি। এক বছরের বেশি সময় কাজ স্থগিত থাকে। পরে ২০২১ সালের অক্টোবর হতে পুনরায় কাজ শুরু হয়।
সূত্র জানায়, করোনা মহামারির কারণে বাজারমূল্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাব কন্ট্রাক্টর প্রতিষ্ঠান দুটি প্রকল্পের প্রাক্কলিত মূল্য অতিরিক্ত ১৯৮ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করে। অধিকাংশ যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে গেলেও বিষয়টি বিবেচনায় নেয়নি বিপিসি। পরে পূর্ব কাজের বাজারদর বিবেচনা না করে পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট (পিডব্লিউডি) ২০১৮- এর শিডিউল অনুসরণ করে। এক বছরের বেশি সময় পরে বিপিসি মাত্র ৮২ কোটি বাড়ায়।
তবে নতুন অনুমোদিত মূল্যে অনীহা প্রকাশ করে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে অসম্মতি জানিয়ে সিএমইসিসি লিড পার্টনারের দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করে। পরে প্রকল্পের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বারাকা ইঞ্জিনিয়ারিং লিড পার্টনারের দায়িত্ব নেয়।
দায়িত্ব নেওয়ার পর পাঁচটি ট্যাংক, সাব স্টেশন, কন্ট্রোল রুম, ওয়্যার হাউস নির্মাণকাজ শুরু হয়। একইসঙ্গে বারাকা ইঞ্জিনিয়ারিং প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন বসানোর কাজ শেষ করে। এছাড়া সেই সময় পর্যন্ত যন্ত্রাংশ কিনতে ৩৪টি ক্রয়াদেশ দেয়।
এদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কাঁচামালের মূল্য ও টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের মূল্য এবং পণ্য পরিবহনের খরচ অনেক গুণ বেড়ে যায় তখন। এমন পরিস্থিতিতে ঠিকাদাররাও পূর্বনির্ধারিত মূল্যে নির্মাণকাজ চালিয়ে যেতে অপারগতা প্রকাশ করে মূল্যবৃদ্ধির অনুরোধ করে। বারাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ২০২২ সালের ৬ নভেম্বর এনকেএফটিসিএলকে প্রায় ৪৬৮ কোটি টাকার সংশোধিত মূল্য প্রস্তাব করে। তবে সেই প্রস্তাব বিবেচনায় না নিয়ে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনকেএফটিসিএল কোনো ধরনের লিখিত বা মৌখিক যোগাযোগ ছাড়াই গোপনে নতুন প্রতিষ্ঠান বিল্ডস্টোন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বিসিসিএল) প্রকল্পের কাজ হস্তান্তরের চেষ্টা চালায়।
বিসিসিএলের প্রস্তাবিত ৬৬৩ কোটি টাকার প্রাক্কলন একতরফাভাবে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়। যদিও বারাকা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রস্তাবিত মূল্য বিল্ডস্টোনের প্রস্তাবের চেয়ে অনেক কম ছিল। এছাড়া, প্রকল্পের প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ শেষ করার পরও কেন বারাকা ইঞ্জিনিয়ারিংকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়; সেই বিষয় আলোচনার কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করে প্রতিষ্ঠানটি।
বিপিসি সূত্র জানায়, তারেক সিদ্দিকী সংশ্লিষ্ট বিল্ডস্টোনকে মাত্রাতিরিক্ত মূল্যে কাজ দেওয়ার চেষ্টার বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় এনকেএফটিসিএল ২০২৪ সালের ৭ জুলাই বারাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ও সিএমইসিসির সঙ্গে চুক্তিটি বাতিল করে। এতে কোম্পানি দুটি আর্থিক ও বাণিজ্যিকভাবে গভীর সংকটে নিমজ্জিত হয়।
সূত্রের দাবি, শেখ হাসিনার শাসনামলে তারিক সিদ্দিকীর সঙ্গে যুক্ত একটি কোম্পানি বিল্ডস্টোন এনকেএফটিসিএলের চুক্তি বাতিলের জন্য লবিং করে। তারা প্রকল্পটি নিজেদের হাতে নিতে চেয়েছিল সংশোধিত বাজেট ৪৬৮ কোটি টাকায়। তারিক সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী ও প্রকিউরমেন্ট সেক্টরে প্রভাব বিস্তার করে চুক্তিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রকল্পটি এনকেএফটিসিএল থেকে বাতিল করে ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন ২৪-এর (ইসিবি ২৪) হাতে তুলে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ডেলিগেটেড বা সরাসরি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। প্রকল্পের বরাদ্দ কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ৪২০ কোটি টাকা।
চাঞ্চল্যকর তথ্য হচ্ছে, তারিক সিদ্দিকী-সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান ইসিবি ২৪-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়ায় বেঞ্চমার্ক নামে কাজ করছে। এটি তারিক সিদ্দিকীর বিল্ডস্টোনের একটি ছায়া কোম্পানি। তার সমর্থনপুষ্ট কোম্পানিটি চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইন (সিডিপিএল) প্রকল্পে একটি অংশের কাজে জড়িত ছিল, যা প্রকল্পটির ইনপুট-আউটপুট দক্ষতার ক্ষেত্রে বিপিসির প্রয়োজনীয় মান পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। একইসঙ্গে চুরি, লিকেজ ও অপারেশনাল সমস্যা দেখা দেয়। ফলে প্রজেক্টটি ইসিবি ২৪-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
তারিক সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে আওয়ামী সরকারের সহায়তায় বিমানবন্দর ও প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালে তার বিরুদ্ধে বিমানবন্দর প্রকল্পে ৮১২ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলা করে দুদক। একইসঙ্গে তার সম্পত্তি জব্দের আদেশও দেওয়া হয়।
বর্তমান পরিস্থিতে এনার্জি বিশেষজ্ঞরা সরকারকে সতর্ক করে বলেন, এমন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটি বিমানবন্দরের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক খেলায় এটি বোঝা হয়ে গেছে। এ বিষয়ে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তারিক সিদ্দিকীর দুর্নীতির তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় এই প্রকল্প অবশেষে সফল হবে কি না- তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অংশীজনরা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

