আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জুলাই বিপ্লবে ছিলেন সম্মুখ সারিতে, অতঃপর নতুন যুদ্ধের সৈনিক তারা

আহসান কবীর, যশোর

জুলাই বিপ্লবে ছিলেন সম্মুখ সারিতে, অতঃপর নতুন যুদ্ধের সৈনিক তারা

জুলাই বিপ্লবে সম্মুখ সারিতে ছিলেন যশোরের একদল তরুণ। বিপ্লব শেষেও ক্ষান্ত হননি তারা। নেমে পড়েন নতুন যুদ্ধে। স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ে আহতদের পাশে দাঁড়ান তারা। এখনো চলছে তাদের সেই মহান কাজ।

বিজ্ঞাপন

এই স্বেচ্ছাসেবক দলের অন্যতম মুখ যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও জুলাই অভ্যুত্থানে রাজপথের সৈনিক মেজবাউর রহমান রামিম। তিনি আমার দেশকে বলেন, ‘মাসব্যাপী সংগ্রামের পর ৫ আগস্ট দুপুরে সুসংবাদ মেলে আমরা জিতে গেছি। ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়েছে। ভেবেছিলাম এবার বিশ্রাম পাব, লেখাপড়ায় মন দেব। কিন্তু তা আর হলো কই! ওই বিকালেই যশোর জেনারেল হাসপাতালের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে নিহতদের স্বজনদের আহাজারি আর আহতদের আর্তনাদে। তখন আমরা নিশ্চুপ থাকতে পারিনি। বন্ধুরা মিলে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াই। শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে প্রকাশ্য শত্রু নেই। এটা ছিল মানুষ বাঁচানোর জন্য তাদের পাশে দাঁড়ানোর সংগ্রাম, বলা যেতে পারে মানবিক যুদ্ধ।’

তার ভাষ্য, ‘আমাদের প্রথম উদ্যোগ ছিল আবেগের বশে। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তখনকার জেলা সমন্বয়ক রাশেদ খান এবং অন্যতম নেতা মারুফ হাসান সুকর্ণের নির্দেশনামতো আমরা স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সংগঠিতভাবে কাজ শুরু করি। দু-একদিনের মধ্যে আমাদের ৯-১০ জনকে নিয়ে একটি টিম গড়ে দেন নেতারা। এরও পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক কমিটি হলে সেখানে ছয়টি সেল গঠন করা হয়। এর মধ্যে একটি ছিল স্বাস্থ্য সেল। এই সেলের সম্পাদক করা হয় আমাকে। সেই যে শুরু করেছি, আজও কাজ চলছে অবিরাম।’

৫ আগস্ট হাসিনার পলায়নের পরপরই বিকাল নাগাদ যশোরে ঘটে যায় হৃদয়বিদারক এক ঘটনা। একদল তরুণ ভাঙচুর শেষে আগুন দেয় শহরের চিত্রা সিনেমা মোড়ে অবস্থিত ১৭ তলাবিশিষ্ট পাঁচতারকা হোটেল জাবিরে; যেটি ছিল যশোরে দুঃশাসনের প্রতীক। এ ঘটনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২৩ জনই গণঅভ্যুত্থানে সম্পৃক্ত ছিলেন অথবা উদ্ধারকারী হিসেবে ভূমিকা রেখেছিলেন। সেখানে আহতদের কেউ কেউ আজও সুস্থ হতে পারেননি। এছাড়া রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যশোরের যেসব তরুণ গুলিবিদ্ধ বা অন্য কোনোভাবে হতাহত হয়েছিলেন, তাদের বা তাদের পরিবারেরও নিবেদিতপ্রাণ সেবক রামিমরা।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংগঠকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, স্বাস্থ্য সেলে বেশ জনবল থাকলেও মূলত চারজন ছিলেন ফ্রন্টলাইনার। তারা হলেন মেজবাউর রহমান রামিম, শোয়াইব হোসাইন, তাশরিক মোস্তফা ও হুসাইন আহমেদ অয়ন। এসব তরুণ মারুফ হাসান সুকর্ণ, তাসকিন আহমেদ তাজিন, এনএস সজীব, ইমনসহ অন্য সহকর্মীদের কাছ থেকে অকাতরে সহযোগিতা পেয়েছেন বলে জানান। তাদের মতে, অনেকের অবদান ছাড়া ভালো কোনো কাজ এগিয়ে নেওয়া দুরূহ।

স্বাস্থ্য সেলের অন্যতম সদস্য যশোর সরকারি সিটি কলেজের শিক্ষার্থী তাশরিক মোস্তফা বলছিলেন, ‘হতাহতদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে দেখি কাজ করার ক্ষেত্র ব্যাপক। প্রথমেই আমরা চেষ্টা করি জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার মান বাড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগী করে তুলতে। অক্সিজেন, খাবার, পরিচ্ছন্নতা, অস্থায়ী কর্মীদের স্বার্থ প্রভৃতি বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে দিনের পর দিন কাজ করতে হয়েছে।’

‘জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে যখন হতাহতদের বিষয়টি যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু হয়, তখনো আমরা শুরু থেকেই তার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ম্যাজিস্ট্রেট, স্বাস্থ্য বিভাগ ও ছাত্রপ্রতিনিধির সমন্বয়ে যে টিম বাড়ি বাড়ি গিয়েছিল, আমরা সেই টিমে অংশ নিই নিজেদের জনবল ভাগ করে’—বলছিলেন তাশরিক।

এমএম কলেজের রসায়ন বিভাগের ছাত্র হুসাইন আহমেদ অয়নের ভাষ্য, ‘বাড়ি বাড়ি ভিজিট করে আমরা যে তথ্য সংগ্রহ করেছি, তা সরকার, ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মী ও ভবিষ্যতে ইতিহাসবিদদের জন্য অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। আমরা দেখেছি, আন্দোলনে অংশ না নিয়েও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ কর্মীর নাম কীভাবে শহীদের তালিকায় ওঠানোর চেষ্টা হয়েছে। আবার আন্দোলনে আহত হওয়া অনেক ব্যক্তি যোগাযোগের অভাবে তালিকার বাইরে ছিলেন। আমরা দিন-রাত খেটে চেষ্টা করেছি তাদের খুঁজে বের করে তালিকাভুক্ত করতে।’

রাজধানীতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন যশোরের তরুণ ইমন কবির। আবার যশোরে জাবির হোটেলে আটকেপড়া লোকজনকে উদ্ধার করতে গিয়ে মই ভেঙে গুরুতর আহত হন আব্দুল হাকিম আপন। এ দুজনই নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তান। তাদের চিকিৎসা থেকে শুরু করে অন্যান্য সহায়তায় কী কী ভূমিকা রেখেছিলেন—সলজ্জভাবে তার বর্ণনা দিচ্ছিল তরুণদের এই দল।

তাদের কথার সঙ্গে মিল পাওয়া যায় সাভারের সিআরপিতে চিকিৎসারত আপনের মা লাবণী বেগমের ভাষ্যে। তিনি আমার দেশকে বলেন, ‘রামিম, অনন্যাসহ অন্য ছাত্রপ্রতিনিধিরা আমার সন্তানের জন্য যা করেছে, তা কখনো ভুলব না। ওরা আমার নিজের সন্তানের চেয়ে কম নয়।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যশোরের সদ্য পদত্যাগী আহ্বায়ক রাশেদ খান আমার দেশকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য সেলের তরুণরা অসাধারণ কাজ করেছে, এখনো করে চলেছে। এমন কোনো দিন নেই যেদিন ওদের কাছে হতাহতদের পরিবার থেকে কয়েকটি ফোনকল আসে না। ওরা সাড়াও দেয় দ্রুততার সঙ্গে। এসব তরুণের কাজে আমরা গর্বিত।’

এ প্রসঙ্গে যশোরের জেলা প্রশাসক আজাহারুল ইসলাম বলেন, ‘আহতদের চিকিৎসা সহায়তা, প্রকৃত আহতদের শনাক্ত করা প্রভৃতি কাজে এই তরুণরা অসামান্য কাজ করেছে।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন