যশোর জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে চারটির সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে একটি আসন (যশোর-৬) গঠনের আবেদন জানিয়েছেন সুকৃতি কুমার মণ্ডল নামে এক ব্যক্তি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সীমানা পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে নতুন সংসদীয় এলাকা গঠন করা হলে সেটি হবে হিন্দু প্রভাবিত একটি আসন।
আবেদনকারী সুকৃতি মণ্ডল বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি নামে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত একটি দলের সভাপতি। ফলে তার প্রস্তাবিত আসনটি বিশেষ ধর্মানুসারীদের সুবিধার কথা বিবেচনায় রেখে প্রস্তাব করা হয়েছে বলে রাজনীতিকরা মনে করছেন। যদিও তার আবেদনে কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।
যশোর জেলার কেশবপুর, মনিরামপুর, বাঘারপাড়া ও অভয়নগর উপজেলাজুড়ে একটি বিশাল এলাকা ‘৯৬ গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত। একসময় এই ৯৬ গ্রামে শুধুই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাস ছিল। এখন এখানকার কোনো কোনো গ্রামে কিছু মুসলিমের বসবাসও গড়ে উঠেছে। তবে ৯৬ গ্রাম এখনো মূলত হিন্দু অধ্যুষিত। সুকৃতি মণ্ডলের প্রস্তাবিত সংসদীয় আসনটি কার্যত ৯৬ গ্রামকেন্দ্রিক।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালের মে মাসে। সেখানে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যশোর জেলার মোট জনসংখ্যা ৩০ লাখ ৭৬ হাজার ১৪৪। এর মধ্যে মুসলিমের সংখ্যা ২৭ লাখ ৫৬ হাজার ৭২৯ এবং হিন্দু তিন লাখ ১৩ হাজার ৫৯২ জন। বাদবাকিরা খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। এ হিসাবে জেলার জনসংখ্যার ৮৯ দশমিক ৬১ শতাংশ মুসলিম এবং ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ হিন্দু।
বর্তমানে যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে ১৮ বছরের বেশি বয়স্ক জনসংখ্যা দুই লাখ ৮০ হাজার ৯৩২। এর মধ্যে মুসলিম দুই লাখ ৩৪ হাজার ৮২৩ এবং হিন্দু ৪৫ হাজার ৭৭০ জন। অর্থাৎ, ১৮ ঊর্ধ্ব জনসংখ্যার ৮৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ মুসলিম ও ১৬ দশমিক ২৯ শতাংশ হিন্দু।
সুকৃতি কুমার মণ্ডল তার প্রস্তাবিত যশোর-৬ আসনে গোটা অভয়নগর উপজেলা, মনিরামপুর উপজেলার ঢাকুরিয়া, দুর্বাডাঙ্গা, হরিদাসকাঠি, কুলটিয়া, মনোহরপুর ও নেহালপুর এবং কেশবপুর উপজেলার গৌরিঘোনা, পাঁজিয়া ও সুফলাকাঠি ইউনিয়নকে চেয়েছেন। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, এ এলাকার মোট ১৮ ঊর্ধ্ব জনসংখ্যা দাঁড়াবে তিন লাখ ৯৩ হাজার ৯৩৯। এর মধ্যে দুই লাখ ৯৪ হাজার ৬৬৪ জন মুসলিম এবং ৩৬ হাজার ৬০১ জন হিন্দু। অর্থাৎ, মোট ভোটারের ৭৪ দশমিক ৭৯ ভাগ মুসলিম এবং ২৫ দশমিক ১০ ভাগ হিন্দু।
সাদা চোখে দেখা যায়, যেখানে জেলার মোট জনসংখ্যার ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ হিন্দু, সেখানে সুকৃতি মণ্ডলের প্রস্তাবিত আসনটিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীর হার দাঁড়াবে ২৫ ভাগেরও বেশি। অর্থাৎ, বাস্তবায়িত হলে এটি হবে হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রভাবিত সংসদীয় আসন।
এ বিষয়ে জানতে সুকৃতি মণ্ডলের নম্বরে কল করা হলে এক ব্যক্তি বলেন, ‘স্যার অসুস্থ। যা বলার আমাকে বলুন।’ তবে তিনি নিজের পরিচয় দিতে অস্বীকৃতি জানান।
এ বিষয়ে যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন আমার দেশকে বলেন, মাইনরিটি প্রভাবিত আসন করতে চাইলে ধরে নিতে হবে তার পেছনে দুরভিসন্ধি আছে। আমরা মেজরিটি-মাইনরিটি কনসেপ্টে বিশ্বাসী নই। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তাসহ অন্যান্য ইস্যুতে বিএনপি সব সময়ই আন্তরিক। ফলে তাদের জন্য আলাদা আসনের কোনো চক্রান্ত মানা হবে না। তাছাড়া নওয়াপাড়া শিল্পাঞ্চল তিনটি সংসদীয় আসনে বিভাজিত বলে যে যুক্তি সুকৃতি উপস্থাপন করেছেন, তাও অসার।
জামায়াতে ইসলামী জেলা শাখার আমির অধ্যাপক গোলাম রসুল আমার দেশকে বলেন, তিনি কি আলাদা হিন্দুরাজ্য করতে চান? এ ধরনের চিন্তা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করবে। এছাড়া ভবদহের জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য এলাকাটি একটি সংসদীয় আসনের অন্তভুর্ক্ত করার যে যুক্তি সুকৃতি তুলে ধরেছেন, তা পুরো ভ্রান্ত। ভবদহ এলাকা আরো বিস্তৃত।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৮ সালে ওয়ান-ইলেভেনের সরকার যে সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করেছিল, সেখানে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কেশবপুর ও অভয়নগর উপজেলা নিয়ে যশোর-৬ আসন গঠন করেছিল নির্বাচন কমিশন। দুটি বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক অঞ্চল নিয়ে একটি সংসদীয় আসন গড়ার সুযোগ আইনানুযায়ী নেই। সে কারণে পরে যশোরের সংসদীয় আসনগুলো আগের আদলেই ফিরিয়ে আনা হয়।
অভয়নগর উপজেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক গোলাম হায়দার ডাব্লু জানান, ২০০৮ সালের ওই নির্বাচনে সংসদ সদস্য প্রার্থী হয়েছিলেন সুকৃতি মণ্ডল। এরপর প্রায় সব দলের বর্জনের ডাক অগ্রাহ্য করে তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনেও অংশ নেন যশোর-৪ আসন থেকে। দুবারই তিনি খুবই সামান্য ভোট পান। তিনি বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতে লেখাপড়া করেছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে তার সম্পর্ক উত্থান-পতনের।
সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস চেষ্টার প্রতিবাদে যশোরে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী আন্দোলন করে আসছে। প্রধান দুই রাজনৈতিক দল এই ইস্যুতে গণমিছিল, সংবাদ সম্মেলন, ঘেরাও, স্মারকলিপি দেওয়ার মতো কর্মসূচি পালন করেছে। গত ২৫ আগস্ট এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে শুনানি হয়। শুনানিতে সুকৃতি মণ্ডল গরহাজির ছিলেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

