সুন্দরবন ধ্বংসে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে: প্রতিমন্ত্রী

সুন্দরবন ধ্বংসে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে: প্রতিমন্ত্রী

সুন্দরবন ধ্বংস, বনজ সম্পদ লুট, বিষ দিয়ে মাছ শিকার কিংবা পরিবেশ-বিধ্বংসী যেকোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেছেন, দেশের পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্য রক্ষায় সুন্দরবনের কোনো বিকল্প নেই। এই বন কেবল একটি বনাঞ্চল নয়, এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের অন্যতম প্রধান রক্ষাকবচ। তাই সুন্দরবনের ক্ষতি করে এমন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।

শনিবার (২৫ জুলাই) দুপুরে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে ‘টেকসই উন্নয়নের জন্য সুন্দরবন ও উপকূলীয় জীবিকার সুরক্ষা’ শীর্ষক দিনব্যাপী নাগরিক সংলাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদকে দীর্ঘদিন ধরে রক্ষা করে আসছে সুন্দরবন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বনাঞ্চলের ক্ষতি করছে এ অঞ্চলেরই একটি অসাধু চক্র। বনজ সম্পদ আহরণ, বিষ দিয়ে মাছ শিকার, অবৈধভাবে বন ব্যবহার এবং পরিবেশ-বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সুন্দরবনের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। এ অবস্থায় সুন্দরবন রক্ষায় সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের অভিযোগে যদি বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দেখে নয়, আইন অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার পরিবেশবান্ধব উন্নয়নে বিশ্বাসী। প্রধানমন্ত্রী সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। পাহাড় কাটা, অবৈধভাবে গাছ নিধন এবং পরিবেশ ধ্বংসকারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে।

তিনি জানান, পরিবেশ দূষণ কমাতে দেশের কোনো ইটভাটায় কাঠ পোড়াতে দেওয়া হবে না। পাশাপাশি নতুন করে আর কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নেই। ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌর ও বায়ুশক্তিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এছাড়া বায়ুদূষণ কমাতে রাজধানী ঢাকায় ২০ থেকে ২৫ বছর পুরনো বাস পর্যায়ক্রমে সড়ক থেকে প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে ও বনজীবীদের কল্যাণে সরকার বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। প্রথমবারের মতো উপকূলীয় ৮ হাজার ২৭১টি জেলে পরিবারের জন্য ৬৬১ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা তাদের জীবিকা নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, সুন্দরবন শুধু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের সম্পদ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই বনকে সংরক্ষণ করা আমাদের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। এজন্য সরকারি সংস্থার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করতে হবে।

নাগরিক সংলাপের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়কারী শরীফ জামিল। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান, বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আলীম, বাগেরহাট জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন, খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ, মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আক্তার সুমী, মোংলা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. রেফাতুল ইসলাম, এনসিপির কেন্দ্রীয় নেত্রী মনিরা শারমিন, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মান্নান হাওলাদার, পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চ খুলনার সাধারণ সম্পাদক সুতপা বেদজ্ঞ এবং সুন্দরবন জাদুঘরের পরিচালক সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, সুন্দরবন রক্ষায় শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবেশবিষয়ক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং বননির্ভর মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাও জরুরি। তারা রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার বিষয়গুলোকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

পরে অনুষ্ঠিত বিশেষ অধিবেশনে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জীবন-জীবিকা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, সুন্দরবন রক্ষা করা গেলে শুধু জীববৈচিত্র্য নয়, দেশের অর্থনীতি, উপকূলীয় মানুষের নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যও দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত থাকবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন