বাগেরহাটের মোংলা চাঁদপাই ইউনিয়নের নারকেলতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পে সরকারি ঘর বরাদ্দ নিয়ে উঠেছে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, একই পরিবারের তিন সদস্যের নামে তিনটি সরকারি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি সরকারি ঘর দখল, বিক্রির চেষ্টাসহ প্রকল্প এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার অভিযোগও তুলেছেন এলাকাবাসী। অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একই পরিবারের তিন সদস্য কাকলি, মর্জিনা ও তাদের ভাই কবিরের নামে তিনটি সরকারি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাদের স্থায়ী ঠিকানা সুন্দরবন ইউনিয়নের বাঁশতলা ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় ছিলেন।
অথচ প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীন অনেক পরিবার এখনও সরকারি ঘর থেকে বঞ্চিত রয়েছে বলে দাবি তাদের। তারা বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত উপকারভোগীদের তালিকা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বরাদ্দপ্রাপ্তদের একজন দীর্ঘদিন বিদেশে থাকায় তার নামে বরাদ্দকৃত ঘরে প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে একটি অসহায় পরিবার বসবাস করে আসছে। ওই পরিবারটি নিজ উদ্যোগে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েছে, সন্তানদের স্থানীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি করেছে এবং ভোটার তালিকায়ও নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে বলে দাবি তাদের।
ভুক্তভোগী খুশি বেগম বলেন, বিদেশে থাকা বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তাকে ওই ঘরে থাকতে বলা হয়েছিল। সেই বিশ্বাসে তিনি পরিবার নিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করেন। দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর পর এখন ঘর ছেড়ে দিতে বলা হচ্ছে। এতে পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে বলে জানান তিনি।
খুশি বেগমের স্কুলপড়ুয়া মেয়ে হালিমা আক্তার জানায়, ঘর ছাড়তে হলে তার লেখাপড়া ব্যাহত হবে। সামনে পরীক্ষা থাকায় নতুন পরিবেশে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে বলেও জানায় সে।
এদিকে বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি দেশে ফিরে নিজের ঘর বুঝে নিতে চাইলে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এতে উচ্ছেদের আশঙ্কায় দিন কাটছে পরিবারটির।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইকরাম আলী ইজারাদারের প্রভাব এবং সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে সরকারি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। এছাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে রাতে মাদকের আসর বসার অভিযোগও তুলেছেন তারা।
আরও অভিযোগ রয়েছে, আশ্রয়ণ প্রকল্পের এ-৪/৯২ ও ৪৪ নম্বর সরকারি ঘর বিক্রির চেষ্টাও হয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, সরকারি সম্পদ ব্যক্তিগতভাবে বিক্রির এমন অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।
এ বিষয়ে তৎকালীন সুন্দরবন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইকরাম আলী ইজারাদারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, ঘর বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কিছু জনপ্রতিনিধির ভূমিকাও তদন্ত করে দেখা উচিত। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সুন্দরবন ইউনিয়ন ১.২.৩ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য জোসনা বেগম বলেন, ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দের বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলতে পারবেন। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’
অন্যদিকে, বরাদ্দপ্রাপ্ত কাকলি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘সরকারি নিয়ম অনুযায়ীই তিনি ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন এবং নিজের বরাদ্দকৃত ঘর বুঝে নিতে এসেছেন।’
মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আক্তার সুমি জানান, অভিযোগটি তাদের নজরে এসেছে। তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরো জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ উপজেলা বন্দোবস্ত কমিটির মাধ্যমে হয়ে থাকে।
প্রবাসীর নামে ঘর বরাদ্দ কিংবা বরাদ্দকৃত ঘর অন্য কাউকে ব্যবহার করতে দেওয়ার বিষয়টিও তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু ঘর বরাদ্দে অনিয়ম, একই পরিবারের নামে একাধিক ঘর বরাদ্দ, ঘর দখল ও বিক্রির চেষ্টার মতো অভিযোগে সেই উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তাই পুরো ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

