মোবাইলে আসক্তি বাড়ছে শিশু-কিশোরদের

হারিয়ে যাচ্ছে হাডুডু, গোল্লাছুট কানামাছি, লাটিম ও ঘুড়ি ওড়ানো

জি এম মনিরুজ্জামান, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)

হারিয়ে যাচ্ছে হাডুডু, গোল্লাছুট কানামাছি, লাটিম ও ঘুড়ি ওড়ানো

এক সময় বিকাল হলেই গ্রামবাংলার মাঠ-ঘাট মুখর হয়ে উঠত শিশু-কিশোরদের কোলাহলে। হাড়ুডু, গোল্লাছুট, কানামাছি, ঘুড়ি উড়ানো খেলায় ব্যস্ত সময় কাটাত শিশু ও কিশোররা।

এসব খেলা গ্রামাঞ্চলের ঐতিহ্য ছিল। লেখাপড়ার ফাঁকে চলত এসব খেলা । কারো হাতে রঙিন কাঠের লাটিম, কারো হাতে সুতা (লতি)। একবার ঘুরিয়ে দেওয়ার পর কার লাটিম কতক্ষণ ঘুরবে, কার লাটিম প্রতিপক্ষের লাটিমকে আঘাত করে মাঠের বাইরে পাঠাবে, তা নিয়েই চলত জমজমাট প্রতিযোগিতা। লাটিমকে ঘিরে গড়ে উঠত বন্ধুত্ব, হাসি, আনন্দ আর শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি।

বিজ্ঞাপন

ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী খেলা লাটিম। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ অনুসারে, স্পিনিং টপের মতো খেলার উৎপত্তি কমপক্ষে চার হাজার বছর আগে। মেসোপটেমিয়া, প্রাচীন মিশর এবং সিন্ধু উপত্যকায় মাটির তৈরি লাটিম পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ও ভারতে কাঠের লাটিম দড়ি দিয়ে ঘুরিয়ে খেলার প্রচলন শত শত বছর ধরে চলে আসছে। সাধারণত পেয়ারা বা গাব গাছের নরম কাঠ দিয়ে তৈরি হয় লাটিম। দড়ি তৈরিতে আগে পাটের সুতা ব্যবহার হতো, এখন বাণিজ্যিক সুতা চলছে। গ্রামীণ জীবনে এটি শুধু খেলা নয়, বরং ধৈর্য, প্রতিযোগিতা, হার-জিত মেনে নেওয়া এবং সামাজিক বন্ধন গড়ে তোলার মাধ্যম ছিল।

কিন্তু সময় বদলেছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ইউটিউব, ফেসবুক ও অনলাইন গেমের আকর্ষণে সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদ থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী লাটিম খেলা। যে মাঠ একসময় শিশুদের পদচারণায় মুখর থাকত, সেখানে এখন বিকালের নীরবতা। আর শিশুদের একটি বড় অংশের অবসর কাটছে মোবাইলের পর্দায়।

সাম্প্রতিক গবেষণা অনুসারে, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে প্রায় ৮৫.৮% অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমে ভোগে, যা অস্বাস্থ্যকর। এতে শারীরিক সুস্থতা, সামাজিক দক্ষতা এবং মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।

শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, পদ্মপুকুর, মুন্সীগঞ্জ, নূরনগর, কৈখালীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে একসময় লাটিম ছিল শিশুদের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজতেই বই-খাতা রেখে ছুটে যেত মাঠে। কখনো প্রতিযোগিতা, কখনো আনন্দের খেলায় মেতে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ঈদ কিংবা গ্রামীণ মেলায় নতুন লাটিম কেনা ছিল শিশুদের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত আনন্দ । এখন সেই দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। গ্রামের মেলায় লাটিমের দোকান আগের মতো দেখা যায় না। নতুন প্রজন্মের অনেক শিশুই জানে না লাটিম কীভাবে ঘোরাতে হয়। হাড়ুডু, গোল্লাছুট, কানামাছি, ঘুড়ি উড়ানোসহ অন্যান্য গ্রামীণ খেলাগুলো একইভাবে হারিয়ে যাচ্ছে।

নূরনগর ইউনিয়নের প্রবীণ আব্দুল গফুর গাজী স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমাদের ছোটবেলায় বিকাল মানেই ছিল মাঠ। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় হাতে থাকত লাটিম আর সুতা। কে কত সুন্দর ঘুরাতে পারে, তা নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে কত প্রতিযোগিতা হতো।

সন্ধ্যায় মায়ের ডাক না আসা পর্যন্ত বাড়ি ফিরতাম না। এখন দেখি নাতিরা মাঠে নয়, মোবাইলের স্ক্রিনে ডুবে থাকে। সেই প্রাণবন্ত বিকালগুলো যেন গল্প হয়ে গেছে। একই এলাকার আলাউদ্দিন সরদার বলেন, গ্রামের মেলায় বাবা আমাদের জন্য নতুন লাটিম কিনে দিতেন। নতুন লাটিম হাতে পাওয়ার আনন্দ ছিল ঈদের নতুন জামার মতো। বাড়ি ফিরেই বন্ধুদের ডাকতাম। এখন মেলায় গেলে লাটিম খুব একটা দেখা যায় না। প্রযুক্তির ভিড়ে শৈশবের আনন্দগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের নজরুল ইসলাম মোল্যা বলেন, লাটিম শুধু খেলা ছিল না, এটি ছিল বন্ধুত্বের একটি মাধ্যম। খেলতে খেলতে আমরা ধৈর্য শিখেছি, হার-জিত মেনে নিতে শিখেছি। এখন শিশুরা একসঙ্গে খেলতে শেখার সুযোগ কম পাচ্ছে। সবাই নিজের মোবাইল নিয়েই ব্যস্ত।

স্থানীয় এক অভিভাবক রহিমা বেগম বলেন, আগে সন্তানদের মাঠে পাঠাতে বলতে হতো না। এখন মোবাইল থেকে সরানোই কঠিন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কার্টুন বা গেম দেখে চোখ লাল হয়ে যায়, কিন্তু মাঠে যেতে চায় না।

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবুল কাশেম মণ্ডল বলেন, প্রযুক্তি জীবনের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু প্রযুক্তি যদি শিশুদের মাঠ, খেলাধুলা ও সামাজিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের বিষয়। একটি শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশে মাঠের বিকল্প নেই।

শিক্ষাবিদ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, নিয়ন্ত্রণহীন স্ক্রিন নির্ভরতা শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে নতুন সংকট তৈরি করছে। মাঠে খেলাধুলা শিশুদের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মনোযোগ, আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব, দলগত কাজ করার মানসিকতা এবং সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাদের মতে, হারিয়ে যাওয়া এসব গ্রামীণ খেলাকে ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও অভিভাবকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। স্কুলভিত্তিক গ্রামীণ ক্রীড়া উৎসব, ইউনিয়ন-উপজেলা পর্যায়ে ঐতিহ্যবাহী খেলার প্রতিযোগিতা এবং মেলায় এসব খেলার আয়োজন বাড়ানো গেলে নতুন প্রজন্মের কাছে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন