যশোরের চাঁচড়ার ঐতিহাসিক শ্রীশ্রী দশমহাবিদ্যা মন্দিরে শর্তসাপেক্ষে প্রবেশের পর ধীরে ধীরে পুরো মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বা ইসকনের হাতে চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে সম্প্রতি এক কিশোরীর আত্মহত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত হওয়ার পর ইসকনের সদস্যরা আত্মগোপনে চলে গেছেন। তাদের কেউ এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়নি।
স্থানীয় হিন্দুদের দাবি, ২০১৬ সালে মন্দির সংস্কার ও পূজা-অর্চনায় সহযোগিতার কথা বলে স্থানীয় প্রভাবশালী হিন্দুদের অনুরোধে ইসকনকে যুক্ত করা হয়। তবে পরে মন্দিরের প্রবেশাধিকার, দানবাক্স, পানি-বিদ্যুৎ এবং চত্বরের ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে চত্বরে দীর্ঘদিন বসবাসকারী কয়েকটি পরিবারকে উচ্ছেদের চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে।
মন্দির কমিটির সভাপতি বিশ্বনাথ দত্ত বলেন, ইসকনকে আনার সময় শর্ত ছিল- তারা মন্দিরের মূল কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করবে না এবং চত্বরের একাংশে তাদের কার্যক্রম সীমিত থাকবে। প্রয়োজনে দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের বাইরে জমি কিনে পুনর্বাসনের কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু পরে ওই শর্ত মানা হয়নি বলে তার অভিযোগ। ইতোমধ্যে তিনটি পরিবারকে চত্বর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং আরো কয়েকটি পরিবার উচ্ছেদের আশঙ্কায় রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইসকন নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সাধারণ হিন্দুদের মন্দিরে প্রবেশও সীমিত হয়েছে। দানবাক্স ও অনুদানের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও মন্দির পরিচালনা কমিটির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই বলে অভিযোগ করেছেন কমিটির সভাপতি। এসব অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছেন ইসকনের সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, ১৭ বছর বয়সি শিপ্রা ঘোষের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় মন্দিরের অধ্যক্ষ অনুপম রায় ওরফে অপার গোবিন্দ দাসসহ আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন তার ভাই পাপন ঘোষ। মামলায় যৌন হয়রানি, অশালীন আচরণ ও তার মাকে মারধরের অভিযোগ করা হয়েছে। পরিবারের দাবি, এসব ঘটনায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে শিপ্রা আত্মহত্যা করে।
শিপ্রার মৃত্যুর পর থেকেই অভিযুক্তদের কাউকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না। মন্দির সূত্রে জানা গেছে, অপার গোবিন্দ আত্মগোপনে যাওয়ার পর অভয়নগরের রূপ-সনাতন ধাম থেকে নতুন কয়েকজন সাধুকে সেখানে দেখা যাচ্ছে। তাদের ব্যাপারে কারো কাছে কোনো তথ্য নেই। এমনকি তারা আদৌ বাংলাদেশি কি না, তা নিয়েও সংশয় আছে সাধারণ হিন্দুদের। ফলে মন্দির চত্বরে বসবাসকারীদের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে। তবে অপার গোবিন্দ কোথায় আছেন, সে বিষয়ে মন্দিরসংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
এদিকে, শিপ্রার মৃত্যুর ব্যাপারে গত ২৭ সেপ্টেম্বর আদালতে করা মামলার পর যশোরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সঞ্জয় পাল এ ঘটনায় থানায় কোনো মামলা হয়েছে কি না, তা জানিয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এ পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি।
যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি কবির হোসেন আমার দেশকে বলেন, তিনি এখনো আদালতের কোনো নির্দেশনা পাননি। কোনো আসামিও গ্রেপ্তার হয়নি।
শিপ্রার মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করছে মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোরও। ফলে ঐতিহাসিক মন্দিরটির নিয়ন্ত্রণ, দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের উচ্ছেদ এবং কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় ওঠা অভিযোগ- সবকিছু নিয়েই এখন তদন্তের মুখে পড়েছে ইসকনের কার্যক্রম।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

