ময়মনসিংহে এনসিডি কর্নারে ওষুধ সংকট

নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় বাড়ছে হৃদরোগ-স্ট্রোকের ঝুঁকি

নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় বাড়ছে হৃদরোগ-স্ট্রোকের ঝুঁকি

উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে উপজেলা পর্যায়ে গড়ে ওঠা নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি) কর্নারে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ময়মনসিংহের বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য আসা রোগীরা কিছু ওষুধ পেলেও সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। এতে নিয়মিত চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ রোগীদের হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা।

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার খন্দকপাড়া গ্রামের দরিদ্র কৃষক রফিক মিয়া (৫৫) উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধ সেবনের জন্য তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এনসিডি কর্নারে ফলোআপে আসেন। তার ভাষায়, আগে এলাকায় উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য এমন নির্দিষ্ট সেবা ছিল না। এখন নিয়মিত রক্তচাপ মাপানো এবং চিকিৎসক ও নার্সের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবনের সুযোগ পাচ্ছেন। তবে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের দীর্ঘ সময়, অনেক ক্ষেত্রে সারা জীবন নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় থাকতে হয়। ফলে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত ওষুধ সেবন বন্ধ হয়ে গেলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও মানুষের আয়ু বৃদ্ধি, জীবনযাত্রায় কায়িক পরিশ্রম কমে যাওয়া, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে বাড়ছে অসংক্রামক রোগ বা নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি)। দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগে হয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রায় ৩৪ শতাংশ মৃত্যু হৃদরোগ ও স্ট্রোকজনিত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বাংলাদেশ হাইপারটেনশন কন্ট্রোল ইনিশিয়েটিভের আওতায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কাঠামোবদ্ধ সেবা জোরদার করা হচ্ছে।

এনসিডি কর্নারে রোগীদের নিয়মিত রক্তচাপ ও রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ, জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এবং ফলোআপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে রোগ জটিল পর্যায়ে যাওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, শুধু রোগী শনাক্ত ও নিবন্ধন করলেই হবে না। প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং নিয়মিত ফলোআপ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে এনসিডি কর্নারগুলোকে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকায় তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় নিয়মিত ফলোআপ নিশ্চিত করাও কঠিন হচ্ছে।

এছাড়া রক্তচাপ মাপার যন্ত্র, রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের পর্যাপ্ততা এবং কার্যকারিতাও এনসিডি সেবা চালু রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জাকির হোসাইন বলেন, এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হওয়ায় রোগীরা নিজ এলাকার কাছাকাছি নিয়মিত চিকিৎসা পাচ্ছেন। এতে রোগীরা সময়মতো ফলোআপে আসছেন এবং তাদের কন্ট্রোল রেটও ভালো পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, এর ফলে উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতা, যেমন স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এনসিডি কার্যক্রমকে আরো কার্যকর ও টেকসই করতে প্রয়োজনীয় ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

ডা. জাকির হোসাইন জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে ২০২৫ সালের শেষ দিকে এনসিডি প্রোটোকল অনুযায়ী উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে সরকারি ওষুধ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে সেই ওষুধ প্রায় শেষের দিকে। এনসিডি কর্নারে পর্যাপ্ত ওষুধ না থাকলে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ময়মনসিংহ জেলার সিভিল সার্জন ডা. ফখরুল হাসান চৌধুরী জানান, জেলার আওতায় বর্তমানে প্রায় ৩৪ হাজার উচ্চ রক্তচাপের রোগী এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে নিবন্ধিত হয়ে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, কার্যক্রমকে আরো এগিয়ে নিতে নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি রোগীদের ওষুধ দেওয়ার সঙ্গে স্বাস্থ্যশিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

ময়মনসিংহ স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার সাহা বলেন, বর্তমানে অপারেশনাল প্ল্যান না থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের এমএসআর ফান্ড ব্যবহার করে ওষুধ কেনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এমএসআর ফান্ড থেকে ইনডোরসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীও কেনা হয়। ফলে এনসিডি প্রোটোকল অনুযায়ী পর্যাপ্ত ওষুধ কেনা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, এনসিডি কর্নারে ওষুধের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে ময়মনসিংহ জেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে।

বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে উপজেলা পর্যায়ের এনসিডি কর্নারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে রোগী শনাক্ত ও নিবন্ধনের পাশাপাশি নিয়মিত ওষুধ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, পর্যাপ্ত জনবল এবং ফলোআপ নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন