জামালপুর বিএনপিতে ‘অন্দর যুদ্ধ’: বালুমহাল নিয়ে উত্তাল ফেসবুক, বিব্রত তৃণমূল

শওকত জামান, জামালপুর

জামালপুর বিএনপিতে ‘অন্দর যুদ্ধ’: বালুমহাল নিয়ে উত্তাল ফেসবুক, বিব্রত তৃণমূল

বালুমহালের ইজারাকে কেন্দ্র করে জামালপুর জেলা বিএনপিতে প্রকাশ্য বিভক্তি এখন চরমে পৌঁছেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক গ্রুপের বিরুদ্ধে আরেক গ্রুপের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, ভিডিও বার্তা, সংবাদ সম্মেলন ও কুকীর্তি ফাঁসের হুমকিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। দীর্ঘদিনের চাপা দ্বন্দ্ব এখন ফেসবুককেন্দ্রিক প্রকাশ্য যুদ্ধে রূপ নিয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা বিএনপির রাজনীতি বর্তমানে অন্তত চারটি বলয়ে বিভক্ত। সদর আসনের এমপি ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ওয়ারেছ আলী মামুনের নেতৃত্বে ‘মামুন গ্রুপ’, জেলা যুবদলের সদস্য সচিব সোহেল রানা খানের নেতৃত্বে ‘সোহেল গ্রুপ’, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি শামীম আহমেদের নেতৃত্বে ‘শামীম গ্রুপ’ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ফিরোজ মিয়ার নেতৃত্বে ‘ফিরোজ গ্রুপ’ পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন করছে। আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে গ্রুপিং আরও তীব্র হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।

বিজ্ঞাপন

বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীর দাবি—বালুমহাল, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব বিস্তার ও আর্থিক সুবিধা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করেই এই বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সুবিধাভোগের অভিযোগ এনে একের পর এক ভিডিও ও অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে দলটির ভেতরেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃণমূলের কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেন, “১৭ বছর রাজপথে থেকেও আমরা মূল্যায়ন পাচ্ছি না। এখন সুবিধাবাদী ও হাইব্রিড নেতারাই সব নিয়ন্ত্রণ করছে। যারা দলের দুঃসময়ে ছিল না, তারাই এখন প্রভাবশালী।”

বালুমহাল নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত

গত ১৯ এপ্রিল ব্রহ্মপুত্র নদের চর যথার্থপুর-ছনকান্দা ঘাটের বালুমহালের ইজারার দরপত্র জমা হয় সদর উপজেলা প্রশাসনে। পরে ইজারা পায় ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি শামীম মাস্টারের স্ত্রী রাবেয়া বাসরির মালিকানাধীন ‘শামীম এন্টারপ্রাইজ’।

ইজারা না পাওয়া জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আব্দুস সোবহানের অনুসারীরা অভিযোগ করেন, দরপত্র প্রক্রিয়ায় কারসাজি করা হয়েছে। তাদের দাবি—সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন মিলন ও জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি আব্দুল হালিম নেগোসিয়েশনের নামে অংশগ্রহণকারীদের দরপত্র থেকে বিডি সরিয়ে দেন এবং পরিকল্পিতভাবে শামীম এন্টারপ্রাইজকে ইজারা পাইয়ে দেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রথমে বাকবিতণ্ডা, পরে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও ও ভিডিও ক্লিপ আকারে ছড়িয়ে পড়ে।

এরই মধ্যে জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আব্দুস সোবহান ও জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি আব্দুল হালিমের কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেখানে আব্দুস সোবহানকে বলতে শোনা যায়, “তুই না বইলা চুরি করলি ক্যান? তুই একটা চোর।” জবাবে আব্দুল হালিম বলেন, “সোবহান ভাই, এসব কী বলছেন? আপনার সঙ্গে তো আমার ভালো সম্পর্ক।” সোশ্যাল মিডিয়ায় অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

পরে আব্দুস সোবহান ৪ মে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন, “বালুমহাল ইজারা নিয়ে টেন্ডার সিন্ডিকেট গড়ে তুলে প্রতারণা করা হয়েছে। নেগোসিয়েশনের নামে দরপত্র নেওয়া হলেও পরে সিদ্ধান্ত না জানিয়েই শামীম এন্টারপ্রাইজকে ইজারা পাইয়ে দিতে অন্যদের বিডি সরিয়ে ফেলা হয়।” তবে নিজের নামে প্রচারিত অডিও ক্লিপটি আংশিক সম্পাদনা করে প্রচার করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

amardesh_jamalpur 1

পাল্টা সংবাদ সম্মেলন

অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি শামীম মাস্টার পাল্টা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমার স্ত্রীর নামে যথাযথ নিয়ম মেনেই বালুমহালের ইজারা নেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো ধরনের কারসাজি হয়নি। যারা অভিযোগ করছেন তাদের দরপত্রেই বিডি ছিল না। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেক আইডি ব্যবহার করে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।”

জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি আব্দুল হালিমও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এখানে কোনো কারসাজি হয়নি। আব্দুস সোবহান গ্রুপ পরিবর্তন করার পর থেকেই এসব অভিযোগ তুলছেন।” সোহেল গ্রুপের লোকজন প্রথমে অডিও ক্লিপ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার পর তিনি তার লোকজনকে দিয়ে সঠিক ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করেছেন বলে জানান।

সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন মিলন বলেন, “বালুমহাল নিয়ে চলমান ঘটনায় আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার নাম জড়ানো হচ্ছে।” অন্যদিকে জেলা যুবদলের সদস্য সচিব সোহেল রানা খান বলেন, “সোহেল গ্রুপ প্রথমে অডিও ক্লিপ ছড়িয়েছে—এ দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। রাজনৈতিকভাবে হেয় করতেই এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।”

বিব্রত জেলা বিএনপি

একাধিক পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন, ফেসবুক লাইভ ও ভিডিও বার্তায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে জেলা বিএনপি। অনেক নেতাকর্মী আশঙ্কা করছেন, এই দ্বন্দ্ব চলতে থাকলে সাংগঠনিক ঐক্য আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

জেলা বিএনপির সভাপতি ফরিদুল কবির তালুকদার শামীম এমপি বলেন, “সরকারি নিয়ম মেনেই বালুমহালের ইজারা নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়কে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা কাম্য নয়। সবাইকে সংযত থাকার আহ্বান জানাই।”

তবে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ওয়ারেছ আলী মামুন এমপির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বর্তমানে জামালপুরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ এই কোন্দলই রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। ফেসবুকের ভার্চুয়াল দেয়াল থেকে শুরু করে চায়ের দোকান—সবখানেই চলছে বিএনপির ‘অন্দর যুদ্ধ’ নিয়ে আলোচনা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...