দেশের বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে নদনদীর তীব্র ভাঙন । সিরাজগঞ্জের শাহাজাদপুরে যমুনার, শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মা, শেরপুরের নকলায়মৃগী নদী, ফরিদপুরের মধুখালীতে মধুমতীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ভিটেমাটি, কৃষিজমিসহ নানা স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে । নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছে মানুষ।
রায়গঞ্জ ও শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, যমুনার ক্রমাগত ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের ধীতপুরসহ কয়েকটি গ্রাম । এ গ্রামের ফাহিমা বেগম যমুনার ভাঙনে ৬০ বছর বয়সে দশবার বসতভিটা হারিয়েছেন। এখন অন্যের জমিতে কোনোমতে ঘর তুলে আছেন। সেই আশ্রয়টুকুও পড়েছে যমুনার নদীর তীব্র ভাঙনের মুখে। প্রতিদিনই তার মনে শঙ্কা, কখন আবার মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও নদীতে বিলীন হয়ে যায়। সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, গত এক বছরে উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের ধীতপুর, বারপাখিয়া ও কুরসি এলাকায় প্রায় তিন থেকে চার শতাধিক বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। ধীতপুর ও কুরসি এলাকায় দুই শতাধিক বাড়িঘরের পাশাপাশি তিনটি মসজিদ, একটি মাদরাসা ও দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীতে গেছে। প্রায় তিন হাজার বিঘা আবাদি জমিও নদীর বুকে হারিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ইতোমধ্যে যমুনার অব্যাহত ভাঙনে বারপাখিয়া গ্রামটি পুরোপুরি নদীতে বিলীন হয়েছে। শ্রীপুর, ধীতপুর ও কুরসিসহ কয়েকটি গ্রামের বসতভিটা ও আবাদি জমি এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে। ভাঙনের কারণে অনেক পরিবার অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছে। অনেকেই আছেন জরাজীর্ণ ঘরে।
ধীতপুর গ্রামের আব্দুর রহমান বলেন, বাড়ি নদী থেকে অনেক দূরে মনে হচ্ছিল। পানি দেখে ভাত খেতে বসেছিলাম। খাওয়া শেষ করার আগেই দেখি আমার বাড়ির অনেকটা অংশ নদীতে চলে গেছে। একই গ্রামের সবজি ব্যবসায়ী আবু শামা বলেন, ‘হাটটি নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ায় ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কীভাবে সংসার চালাব, সেই চিন্তায় আছি। ভাঙনে বিদ্যালয় হারিয়েছে ধীতপুর গ্রামের শিক্ষার্থীরা। তারা জানায়, তাদের স্কুলটি নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ায় এখন মাদরাসার টিনের ঘরে ক্লাস করতে হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মখলেসুর রহমান বলেন, ‘চরাঞ্চল হওয়ায় সোনাতনী ইউনিয়নে বর্তমানে ভাঙনরোধে কোনো প্রকল্প চলমান নেই। তবে চরাঞ্চলের উন্নয়নে একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সেটি বাস্তবায়ন হলে ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।’
শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা সারমিন বলেন, ‘ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পুনর্বাসনের বিষয়টিও দেখা হচ্ছে।
শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, শরীয়তপুরের জাজিরার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের আলমখাঁর কান্দিতে পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে মালয়েশিয়া প্রবাসী জুলহাস খানের পুরো বসতবাড়ি।
গত সোমবার দুপুরে তীব্র ভাঙনের সময় বাড়িটিতে ধস শুরু হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই নদীতে বিলীন হয়ে যায় পুরো বাড়ি। প্রবাসে ঘাম ঝরিয়ে তৈরি করা নিজের ঘরটি চোখের সামনে পদ্মায় বিলীন হতে দেখে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা।
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিলটন হোসেন বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকার বিষয়ে তারা অবগত। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নালিতাবাড়ী (শেরপুর) প্রতিনিধি জানান, শেরপুরের নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের চরমধুয়া নামাপাড়া ও দড়িপাড়া গ্রামে চলছে মৃগী নদীরভাঙন। দীর্ঘ এই সময়ে নদীতে বিলীন হয়েছে শত শত বসতভিটা, ফসলি জমি, বাঁশঝাড় ও গাছপালা। অনেকে হারিয়েছেন শেষ সম্বলটুকুও। অথচ দীর্ঘসময়েও ভাঙন ঠেকাতে নেওয়া হয়নি উদ্যোগ।
নদীভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে চরমধুয়া নামাপাড়ার মানুষের চলাচলের একমাত্র কাঁচা রাস্তাটিও। ফলে প্রায় দেড় হাজার মানুষের এ জনপদ অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চরমধুয়া নামাপাড়া ও দড়িপাড়ায় এ বছর প্রায় ৩০-৪০টি বসতঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
মধুখালী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি জানান, ফরিদপুরের মধুখালীতে মধুমতীর ভাঙনে নিঃস্ব পাঁচ গ্রামের মানুষ। এসব অসহায় মানুষকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ভাঙনরোধে নেই কোনো উদ্যোগ । তবে আগের মতো নেই যৌবন। বর্ষায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় যৌবন ফিরে আসে এই মধুমতী নদীতে। ফরিদপুরের মধুখালীতে খরস্রোতা নদী মধুমতী নদীতে বর্ষা এলেই ভাঙন দেখা দেয় । ভাঙনের ভয়াল গ্রাসে বিলীন হয়ে যাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারাচ্ছে শত শত পরিবার। বর্তমানে উপজেলার কামারখালী ইউনিয়নের মধুমতীর কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা ৮ থেকে ১০টি গ্রাম ভাঙনের মুখে পড়েছে। অনেকেই বসতবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। এই ইউনিয়নের বিশেষ করে চরগয়েশপুর, বকসীপুর, চরপুকুরিয়া, বহুলবাড়িয়া, চর বহুলবাড়িয়ার প্রায়ই শতাধিক বসতবাড়ি মধুমতীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে মধুখালী উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাসুদুর রহমান বলেন, পানিবন্দি এবং নদীভাঙনের অসহায় প্রায় ২৫০ পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী ইতোমধ্যেই বিতরণ করেছি। আমাদের খাদ্যসামগ্রী সহযোগিতা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

