চিকিৎসকসহ জনবল সংকট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অচলাবস্থা এবং ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি রোগীর চাপে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। ৫০০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। বহির্বিভাগেও প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসেন দুই থেকে আড়াই হাজার রোগী। অতিরিক্ত রোগীদের শয্যা না থাকায় মেঝে, বারান্দা ও করিডোরে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
রোগীর অতিরিক্ত চাপ সামলাতে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, বহির্বিভাগ ও প্যাথলজি বিভাগ ঘুরে রোগী এবং তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসকসহ অনুমোদিত জনবল রয়েছে ১ হাজার ১২০টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ৯৫৪ জন। শূন্য রয়েছে ১২৬টি পদ।
চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ২১৮টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৩০ জন। ৮৮টি পদ শূন্য, যা মোট পদের প্রায় ৪০ শতাংশ। প্রথম শ্রেণির নার্সিংয়ের চারটি পদের মধ্যে সব কটি পদই শূন্য রয়েছে। হাসপাতালের ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় তিন গুণ রোগী। ২৫০ শয্যার জনবল দিয়ে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ রোগী ভর্তি থাকায় চিকিৎসাব্যবস্থায় তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীকে মেঝেতে, বারান্দা ও করিডোরে থাকতে হচ্ছে। অতিরিক্ত রোগীর কারণে ওষুধ ও খাবার সরবরাহেও চাপ তৈরি হচ্ছে।
বহির্বিভাগেও একই চিত্র। সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত রোগী দেখার সময় নির্ধারিত থাকলেও সকাল ৮টার আগেই টিকিট কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। পরে চিকিৎসকের কক্ষের সামনেও তৈরি হয় রোগীদের দীর্ঘ সারি। এতে গুরুতর অসুস্থ রোগী, শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এমআরআই, সিটি স্ক্যানসহ বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি অচল অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে এমআরআই মেশিনটি প্রায় ১১ বছর ধরে বন্ধ। এ কারণে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রয়োজনীয় এমআরআই পরীক্ষা করাতে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে। এতে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
হাসপাতালে কিছু পরীক্ষা করা হলেও জনবল সংকটের কারণে অনেক সময় দুপুর ১২টার মধ্যেই পরীক্ষার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করান।
দিনাজপুরের বিরল উপজেলার কাদের নেওয়াজ (৭০) নামে এক ব্যক্তি গত সপ্তাহে নিউরো সমস্যায় হাসপাতালে ভর্তি হন। তার ছেলে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান বলেন, তার বাবাকে ভর্তির পর চিকিৎসক ৮ থেকে ১০টি পরীক্ষা দেন। এর মধ্যে রক্তের একটি পরীক্ষা ছাড়া প্রায় সব কটি পরীক্ষাই বাইরে থেকে করাতে হয়েছে।
কাহারোল উপজেলার শরিফুল নামে এক ব্যক্তি কয়েক দিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। তার ভাই জানান, এক্স-রেসহ যেসব পরীক্ষা করানোর জন্য চিকিৎসক বলেছিলেন, সেসব পরীক্ষা বাইরে থেকে করাতে হয়েছে।
হাসপাতালের বহির্বিভাগ, প্যাথলজি বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও প্রধান ফটকের আশপাশে দালালরা কম খরচে এবং দ্রুত পরীক্ষা করিয়ে দেওয়ার কথা বলে রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যান।
চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি হাসপাতালের সিঁড়ি ও ফাঁকা জায়গায় ময়লা-আবর্জনা জমে থাকার পাশাপাশি টয়লেট এবং বাথরুম থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোর অভিযোগ করেছেন রোগী ও স্বজনরা।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. জাহাঙ্গীর কবির আমার দেশকে বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণে কিছু সেবায় বিঘ্ন ঘটছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার অচল যন্ত্রপাতি সচল করতেও কাজ চলছে। এরই মধ্যে এমআরআই ও সিটি স্ক্যান মেশিনকে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন মেশিনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুত মেশিন দুটি পাওয়া যাবে। এছাড়া পরীক্ষার অন্যান্য যন্ত্রপাতি সচল রয়েছে এবং এ নিয়ে কাজ চলমান।’
ডা. জাহাঙ্গীর কবির আরো জানান, এরই মধ্যে এক হাজার শয্যার জনবল কাঠামোর তালিকা প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

