সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে টিআর ও কাবিটা প্রকল্পে গ্রাম উন্নয়নের নামে প্রতিটি ইউনিয়নেই চলছে অনিয়ম ও দুর্নীতি। লুটপাট করা হয়েছে প্রকল্পের অর্থ। প্রকল্প কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে কোনো কাজ না করে বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে টিআর প্রথম পর্বে মাদরা প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে পরিতোষের বাড়ি অভিমুখে ও শালিখা খেয়াঘাট অভিমুখে ইটের রাস্তা সংস্কারের জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ইউপি সদস্য প্রবীর মণ্ডল মাত্র দুই হাজার ইটের কাজ করে এবং পুরাতন রাস্তার ওপর বালু ছড়িয়ে দিয়ে পুরো টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
কাবিটা প্রথম পর্বে মাদরা শ্মশান ঘাটে মাটি ভরাটের কাজে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অর্ধেক টাকার কাজ করে সমুদয় টাকা ইউপি সদস্য নমিতা মণ্ডল উঠিয়ে নিয়েছেন। তবে এই বিল ছাড়াতে পিআইও অফিসকে সন্তুষ্ট করতে হয়েছে । মাগুরা শ্মশান ঘাটের মাটি ভরাটের জন্য কাবিটা প্রকল্পে ৫ দশমিক ৫০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। ইউপি সদস্য রেজাউল ইসলাম নামমাত্র কাজ করে সমুদয় টাকা উঠিয়ে নিয়েছেন।
কাবিটা দ্বিতীয় পর্যায়ে মাগুরা ক্ষত্রীয় পাড়া সুকুমারের জমির মাথা হতে জিতেনের বটতলা পর্যন্ত মাটি দ্বারা সংস্কার কাজে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ইউপি সদস্য রেজাউল ইসলাম এই কাজেও একই ঘটনা ঘটিয়েছেন।
মাগুরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা উত্তম সেন বাবুলাল নিজের প্রতিবন্ধী স্কুলের শিক্ষক দুলাল চন্দ্র বাছাড়কে সভাপতি করে কোনো কাজ না করে টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
মাগুরা জান্নাতুল ফেরদৌস জামে মসজিদের নামে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ নিয়ে স্থানীয় রেজাউল করিমকে সভাপতি করে নামমাত্র কাজ করে সমুদয় টাকা লুটপাট করেছেন।
টিআর দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পে মাগুরাডাঙ্গা অমূল্য মণ্ডলের জমির মাথা হতে মাদরা গেট অভিমুখে খাল পুনঃখনন প্রকল্পে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা গনেষ দেবনাথ খালের ভেতরের অংশ পরিষ্কার করে ও মুখের কিছু অংশের দুই পাশে মাটি কেটে ফেলে ঘুসের বিনিময়ে সমুদয় টাকা উঠিয়ে নিয়েছেন। এই কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই খাল পরিষ্কার করতে পাঁচ দিনে ৯০ জন দিনমজুর কাজ করেছে এবং প্রতিদিন মজুরি হিসেবে ৩৫০ টাকা দেওয়া হয়েছে।
টিআর কাবিটা প্রকল্পে প্রতিটি কাজে ১০ থেকে ৩০ ভাগ টাকা পিআইও অফিসকে ঘুস দিতে হয়। প্রকল্প মাপজোখ করার সময় দুই হাজার, দেখতে গেলে এক হাজার ও ফাইল খরচ এক হাজার ৫০০ টাকা করে দিতে হয়। এছাড়া প্রতিটি ইউনিয়নে দুই-তিনজন করে নিজস্ব মেম্বরের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পের টাকা ভাগাভাগিরও অভিযোগ আছে পিআরও’র বিরুদ্ধে। পিআইও অফিসের চুক্তিভিত্তিক অফিস সহকারী সোহেলের মাধ্যমে এই টাকা ভাগবাঁটোয়ারা হয়।
কাজের অনিয়ম সম্পর্কে জানতে চাইলে উত্তম সেন বাবুলাল বলেন, প্রতিবন্ধী স্কুল ও মসজিদ দুটোই আমার প্রকল্প। জানেন তো অফিসের একটা হিসাব কিতাব থাকে। সে কারণে পুরোপুরি কাজ করা যায় না।
ইউপি চেয়ারম্যান গনেষ দেবনাথ বলেন, খালে কাজের কোনো পরিবেশ ছিল না। অনেক কষ্ট করে কাজ করতে হয়েছে। খালে মেশিন নেওয়া যায়নি বলে, মানুষ দিয়ে কাজ করাতে হয়েছে। এই কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি বলে জানান তিনি।
অপরদিকে পাটকেলঘাটার উত্তর শার্শা অনুকূল দাসের বাড়ি থেকে প্রাইমারি স্কুল অভিমুখে ইটের সলিং কাজের জন্য গম বরাদ্দ থাকলেও যৎসামান্য কাজ হয়েছে।
নগরঘাটা ইউনিয়নের সুমনডাঙ্গা মনসা মন্দির নির্মাণে এক লাখ ২০ হাজার টাকা বাজেট থাকলে মাত্র ৫০ হাজার টাকার কাজ করে শেষ করা হয়েছে।
সরুলিয়া ইউনিয়নের জুসখোলা আমেদ আলী জমির মাথা হতে ইটের সলিং-এর জন্য দুই লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও দায়সারা কাজ করা হয়েছে।
তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের দেওয়ানীপাড়া বাজার সংলগ্ন পাকা রাস্তা হতে ওহাবের বাড়ি পর্যন্ত ইটের রাস্তার জন্য দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা অনুমোদন থাকলেও কোনো কাজ না করে সমুদয় টাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে স্থানীয় লোকের অভিযোগের ভিত্তিতে পুনরায় ইট দিয়ে রাস্তার সংস্কার করা হয়েছে । ইউপি সদস্য মশিয়ার রহমান জানান, টাকা আগে উত্তোলন করা হলেও পরবর্তীতে কাজ শেষ করা হয়েছে।
খেশরা ইউনিয়নের মুরাগাছা মন্দির সংস্কারের জন্য এক লাখ ২০ হাজার টাকা অনুমোদন থাকলেও কোনোরকম কাজ করেই সব টাকা ভাগবাঁটোরা করে নেওয়া হয়েছে ।
উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন বলেন, জুন ক্লোজিংয়ের কারণে বিল দেওয়া হয়েছে ঠিকই। তবে কাজের বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না। প্রতিটি কাজের তদারকি করা হচ্ছে। এই টাকা হজম করার কোনো সুযোগ নেই। কাজ খারাপ হলে আবার সে কাজ করে দিতে হবে। তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল আফরোজ স্বর্ণা বলেন, টিআর কাবিটা প্রকল্পের কাজ পরিদর্শন করা হচ্ছে। যদি কোনো অনিয়ম হয়, তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ আমার দেশকে বলেন, কেউ প্রকল্পের টাকা নিয়ে কাজ না করে টাকা আত্মসাৎ করার প্রমাণিত পেলে, যে ব্যক্তিই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

