রাজশাহী মহানগরীর একটি পরীক্ষাকেন্দ্র। ১১টি বিদ্যালয়ের ২৩৮ শিক্ষার্থী। কয়েক মাসের প্রস্তুতি শেষে তারা অংশ নেয় বহুল প্রতীক্ষিত প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায়। শিক্ষকেরা ছিলেন আশাবাদী, অভিভাবকেরাও স্বপ্ন দেখেছিলেন সন্তানদের সাফল্যের। কিন্তু ফল প্রকাশের দিন সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় এক অস্বাভাবিক ঘটনায়। ওই কেন্দ্রের একজন শিক্ষার্থীরও নাম বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকায় নেই।
এমন নজিরবিহীন ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র কি মূল্যায়নের বাইরে থেকে গেছে, নাকি ফল প্রস্তুতের সময় ঘটেছে বড় ধরনের কারিগরি বা প্রশাসনিক ত্রুটি? ঘটনাটি নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে রাজশাহীতে। গত বৃহস্পতিবার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা এ ঘটনায় বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সামনে মানববন্ধন করেন। পরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে স্মারকলিপি দেন। সেখানে ফল পুনর্মূল্যায়ন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে সংশোধিত ফল প্রকাশের দাবি জানানো হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, রাজশাহী উপশহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ১১টি বিদ্যালয়ের মোট ২৩৮ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেয়। গত ১২ জুলাই প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, ওই কেন্দ্রের একজন শিক্ষার্থীর নামও বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকায় নেই। এমন ঘটনায় বিস্মিত শুধু অভিভাবক নন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরাও।
রাজশাহী উপশহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুর রহমান বলেন, গত ১৫ থেকে ১৮ এপ্রিল বাংলা, ইংলিশ, গণিত, বিশ্বপরিচয় ও বিজ্ঞান বিষয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা শেষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই উত্তরপত্র নিয়ে যান। কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, কেন্দ্রটির কোনো শিক্ষার্থীরই ফল আসেনি। একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফারহানা খাতুনের ভাষায়, এবার আমাদের অত্যন্ত ভালো একটি ব্যাচ ছিল। গত ১০ বছরের মধ্যে এমন মেধাবী ব্যাচ পাইনি। একজনও বৃত্তি না পাওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়।
ফল নয়, হারাল শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসও
ফল প্রকাশের পর থেকে শিক্ষা অফিসে ছুটছেন অভিভাবকরা। কেউ জানতে চাইছেন সন্তানের ফল কোথায়, কেউ আবার উত্তরপত্র হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।বোর্ড মডেল স্কুলের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সৈয়দ আবদুল মুনিম কাজল বলেন, একটি কেন্দ্রের ২৩৮ শিক্ষার্থীর কেউই বৃত্তি পাবে না, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কোথায় ভুল হয়েছে, তা খুঁজে বের করে দ্রুত সঠিক ফল প্রকাশ করতে হবে। শিক্ষকরা বলেন, এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মানসিক আঘাত পেয়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। অনেকেই নিজেদের ব্যর্থ ভাবতে শুরু করেছে, অথচ তাদের প্রকৃত ফলই প্রকাশ হয়নি।
ত্রুটি কোথায়
বোয়ালিয়া থানা শিক্ষা কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম জানান, পরীক্ষা শেষে কেন্দ্র থেকে উত্তরপত্র জেলা প্রশাসকের ট্রেজারিতে পাঠানো হয়। সেখান থেকে অন্য জেলার পরীক্ষকদের মাধ্যমে মূল্যায়ন শেষে ফল প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়। ফলে কোন ধাপে এই অসংগতি ঘটেছে, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনও বিষয়টিকে অস্বাভাবিক বলে স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, এতগুলো উত্তরপত্র হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং ওএমআর পদ্ধতিতে ফল প্রস্তুতের সময় কারিগরি ত্রুটি হয়ে থাকতে পারে। অভিভাবকদের আবেদন অধিদপ্তরে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুরো মূল্যায়ন ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ
২০২০ সালের পর আবার চালু হওয়া প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের মেধা মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিন্তু একটি কেন্দ্রের সব শিক্ষার্থীর ফল অনুপস্থিত থাকা শুধু একটি প্রশাসনিক ভুলের অভিযোগ নয়, এটি পুরো মূল্যায়ন ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। যদি সত্যিই কারিগরি ত্রুটির কারণে ২৩৮ শিক্ষার্থীর ফল প্রকাশ না হয়ে থাকে, তাহলে দেশের অন্য কোথাও একই ধরনের সমস্যা ঘটেনি, সেই নিশ্চয়তা কে দেবে? আর যদি উত্তরপত্র ব্যবস্থাপনায় কোনো গাফিলতি হয়ে থাকে, তবে তার দায় কার?
শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবি একটাই, তদন্ত করে প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে হবে। প্রয়োজন হলে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন করে প্রকৃত ফল প্রকাশ করতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

