শোক কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে শহীদ ওয়াসিমের পরিবার

শোক কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে শহীদ ওয়াসিমের পরিবার

জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় শহীদ হিসেবে পরিচিত ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরামের পরিবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে। ছেলে হারানোর গভীর শোক কাটিয়ে পরিবারের সদস্যরা এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। অর্থনৈতিক সংকটও অনেকটা কমেছে সরকারি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের সহায়তায়। তবে ওয়াসিম হত্যার সুষ্ঠু বিচার এবং পরিবারের এক সদস্যের চাকরির দাবি এখনো তাদের প্রধান প্রত্যাশা।

ওয়াসিম আকরামের বাড়ি কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মুরারপাড়ায়। বাবা-মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এবং কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে মুরাদপুর ফ্লাইওভারের নিচে সংঘর্ষের সময় ছুরিকাঘাতে নিহত হন ওয়াসিম। তার মৃত্যুর পরই সরকারবিরোধী আন্দোলন আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে।

শোক থেকে স্বাভাবিক জীবনে

ছেলের মৃত্যুর পর ভেঙে পড়েছিলেন বাবা শফিউল আলম ও মা জোসনা বেগম। দীর্ঘ সময় কবরের পাশেই কাটিয়েছেন বাবা। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে।

শফিউল আলম বলেন, আমি কৃষিকাজ করি। চাষাবাদ করার পাশাপাশি ১২ একর জমিতে চিংড়িঘের রয়েছে। গত বছর লোকসান হলেও এবার ভালো ফলনের আশা করছি। তিনি বলেন, রিজিকের মালিক আল্লাহ। তিনিই আমাদের জীবিকার ব্যবস্থা করবেন।

পরিবারের নতুন অধ্যায়

ওয়াসিমের বড় ভাই আশেক আলী সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে এসেছেন। ইতোমধ্যে তার বিয়ে হয়েছে। তবে তিনি এখনো কর্মহীন। তার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে একটি সরকারি চাকরির আবেদন করা হয়েছে। সম্প্রতি ওয়াসিমের কবর জিয়ারত করতে এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ চাকরির ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান ওয়াসিমের বাবা।

তিনি বলেন, আমার বড় ছেলে মাদরাসা থেকে ফাজিল পাস করেছে। প্রযুক্তিগত বিষয়েও দক্ষ। সালাহউদ্দিন ভাই (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ) বলেছেন, ছেলের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন।

অন্যদিকে ওয়াসিমের একমাত্র বোন সাবরিনারও বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে কাবিনের মাধ্যমে। শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠানো হবে বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।

যা পেয়েছে ওয়াসিমের পরিবার

ওয়াসিমের পরিবার জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার, বর্তমান সরকার, বিভিন্ন সংস্থা ও রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে তারা প্রায় ৩০ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিবারটিকে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আ. মান্নান এবং পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম জানান, জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে তারা প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে।

ইউএনও রফিকুল ইসলাম আরো জানান, ওয়াসিমের পরিবারের যাতায়াতের রাস্তা নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাড়ির পাশে একটি ছোট মসজিদও নির্মাণ করা হয়েছে।

তবে শফিউল আলমের দাবি, মাসিক ভাতা দিয়ে পুরো পরিবারের ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়। তাই তিনি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের জন্য ২০টি চেয়ার (কিটকট) ও একটি ফিশ ফ্রাই দোকানের অনুমোদনের আবেদন করেছেন। প্রয়োজনীয় ফিও জমা দিয়েছেন, কিন্তু এখনো অনুমোদন পাননি।

খোঁজ রাখে না বিএনপি

শফিউল আলমের অভিযোগ, ছেলে ছাত্রদলের রাজনীতি করলেও বিএনপি তাদের পরিবারের খোঁজখবর নেয় না। তিনি বলেন, রমজানের ঈদের আগে বিএনপির নেতারা বিশাল মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে এসে চার হাজার টাকা দিয়েছেন। এরপর আর তেমন কোনো খোঁজখবর নেই। তবে তিনি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন এবং ছেলের চাকরির আশ্বাস দিয়েছেন।

এ বিষয়ে পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম ইকবাল হোসেন বলেন, ওয়াসিম আকরামের পরিবার কোটি কোটি টাকা পেয়েছে। সরকারিভাবে দেওয়া হয়েছে, বিভিন্ন সংস্থা দিয়েছে। সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। প্রতিমাসে কোনো না কোনোভাবে আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে। ঈদের সময় সরকারি অনুদানের চার হাজার টাকা নিয়ে আমি গিয়েছিলাম।

তিনি আরো বলেন, সালাহউদ্দিন সাহেব ওয়াসিমের ঘর পাকা করে দিয়েছেন। দুই কিলোমিটার রাস্তা পাকা করে দেওয়া হয়েছে। কবরস্থান পাকা করে দেওয়া হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভ করে দেওয়া হয়েছে। বিএনপি ওয়াসিমের পরিবারের খোঁজ রাখছে না—পরিবারের এমন মন্তব্যে তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।

বিচার চায় পরিবার

ওয়াসিম হত্যার সুষ্ঠু বিচার চান তার স্বজনরা। একই সঙ্গে নির্দোষ কেউ যেন মামলায় হয়রানির শিকার না হন, সে দাবিও জানিয়েছেন তারা। শফিউল আলম বলেন, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত হত্যাকারীদের শনাক্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হোক। কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে যেন এই মামলায় জড়ানো না হয়।

হাসিনার রায় নিয়ে প্রতিক্রিয়া

জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ওয়াসিমের বাবা। তিনি বলেন, দ্রুত রায় কার্যকর হলে আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি ধাপ সম্পন্ন হয়েছে বলে মনে করব।

সম্প্রতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গেও তিনি প্রতিক্রিয়া জানান। তার ভাষ্য, এটি তারও দেশ। তিনি চাইলেই আসতে পারেন। কিন্তু তিনি রাজনীতি করতে আসবেন না। তিনি আসবেন ফাঁসির রশি গলায় ঝুলাতে।

যেভাবে শহীদ হন ওয়াসিম

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ওই সময় ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন ওয়াসিম আকরাম। ওই অবস্থাতেই তাকে অমানবিক কায়দায় মারধর করা হয়। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

মৃত্যুর ১৬ ঘণ্টা আগে নিজের ফেসবুক পোস্টে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে একটি আবেগঘন পোস্ট করেছিলেন তিনি। ওই পোস্টে তিনি নিজেকে উৎসর্গ করারও কথা বলেছিলেন। শহীদ হওয়ার একদিন পর ১৭ জুলাই পেকুয়ার মুরারপাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

তারেক রহমান ও কবর জিয়ারত

চলতি বছরের ১৩ জুন কক্সবাজার সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পেকুয়ায় ওয়াসিম আকরামের কবর জিয়ারত করেন। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ কয়েকজন মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের জন্য ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র অনুদান দেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন