রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে পুরোদমে মাঠে নামছেন বিএনপি ও জামায়াতসহ অন্যান্য দলের প্রার্থীরা। রাজনৈতিক সমীকরণে দুই দলের মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। তবে ভোটের লড়াই যতটা না রাজনৈতিক আদর্শের, তার চেয়ে বেশি আর্থিক সক্ষমতা ও অর্থের উৎসকে ঘিরে হয়ে উঠছে অসম প্রতিযোগিতা। প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।
নির্বাচনি ব্যয় নির্বাহের সম্ভাব্য উৎসের বিবরণিতে দেখা গেছে, বিএনপির ছয় প্রার্থীর মধ্যে তিনজন পুরোপুরি নিজের অর্থে ভোট করার ঘোষণা দিয়েছেন। বাকি তিনজনকে নির্ভর করতে হচ্ছে ধারকর্জ ও দানের ওপর। অন্যদিকে জামায়াতের ছয় প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজনই নির্বাচনি ব্যয়ের বড় অংশ জোগাড় করবেন ঋণ ও দানের মাধ্যমে।
রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) বিএনপির প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীনের সম্পদ ২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। নিজস্ব আয় থেকে ২৫ লাখ টাকা খরচ করবেন। জামায়াতের অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের সম্পদ ৩৬ লাখ টাকা হলেও সম্ভাব্য ব্যয় দেখিয়েছেন ৩৭ লাখ টাকা, যার বড় অংশই আসবে ধার ও দানের মাধ্যমে। ভাইয়ের কাছ থেকে ধার নেবেন ৫ লাখ। আত্মীয়স্বজনের দান হিসেবে পাবেন ১৫ লাখ টাকা।
রাজশাহী-২ (সদর) আসনে বিএনপির প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনুর সম্পদ আছে ৯৬ লাখ ৬২ হাজার টাকার। নিজের টাকা থেকে ভোটে খরচ করবেন ১০ লাখ। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে দান হিসেবে নেবেন ১৫ লাখ টাকা।
অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের মোট সম্পদ ২ কোটি ১৭ লাখ ৩০ হাজার টাকার। তিনি ভোট করতে নিজের ১০ লাখ এবং দান হিসেবে পাওয়া ১৭ লাখ টাকা খরচ করবেন বলে উল্লেখ করেছেন।
রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল হক মিলনের সম্পদ এক কোটি ৪৬ লাখ ৪৩ হাজার টাকার। তিনি ভোট করবেন ৪০ লাখ টাকা খরচ করে। এর মধ্যে ৩০ লাখ টাকা নিজের। ধারকর্জ করবেন পাঁচ লাখ, দান হিসেবে পাবেন পাঁচ লাখ।
এ আসনে জামায়াতের আবুল কালাম আজাদের সম্পদ ৪১ লাখ ৭৪ হাজার টাকার। তিনি খরচ করবেন ২৫ লাখ টাকা। নিজের টাকা থাকবে ১০ লাখ, বাকিটা দান হিসেবে পাবেন।
রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে বিএনপির প্রার্থী ডিএমডি জিয়াউর রহমানের ব্যয়ের বড় অংশ দাননির্ভর। মোট সম্পদ ৯০ লাখ ৯৫ হাজার টাকার। তিনি ভোটে খরচ করবেন ৩১ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে নিজের টাকা ১২ লাখ, বাকিটা দান হিসেবে পাবেন।
জামায়াতের প্রার্থী ডা. আব্দুল বারীর সম্পদ এক কোটি ৮০ লাখ ৯ হাজার টাকার। ভোটে খরচ করবেন ২৫ লাখ। পুরোটাই তার নিজের টাকা।
রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলামের সম্পদ প্রায় এক কোটি ৩২ লাখ টাকার। ভোটে তিনি নিজের ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় করবেন।
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মনজুর রহমানের সম্পদ ৫৫ লাখ ২৮ হাজার টাকার। তিনি ২২ লাখ টাকা ভোটের মাঠে খরচ করবেন। এর মধ্যে নিজের টাকা পাঁচ লাখ, ধারকর্জ করবেন ১০ লাখ। বাকি সাত লাখ টাকা পাবেন দান হিসেবে।
রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের বিএনপি এবং জামায়াত উভয়েই উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করবেন ধার ও দানের টাকায়। বিএনপির প্রার্থী আবু সাঈদ চাঁদের সম্পদ আছে ৩২ লাখ ৫৫ হাজার টাকার। তিনি ভোটে ২১ লাখ টাকা খরচ করতে চান। এর মধ্যে নিজের চার লাখ ও ধার করবেন আট লাখ টাকা।
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী নাজমুল হকের সম্পদ ২৯ লাখ ৯৬ হাজার টাকার। তিনি ভোটে খরচ করতে চান ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে তার নিজের টাকা পাঁচ লাখ, ধার করবেন ৬ লাখ। আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে দান হিসেবে নেবেন ১৪ লাখ টাকা।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রার্থীদের নির্বাচনি ব্যয় এতো হওয়ার কথা নয়। কিন্তু পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে এখন ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ দেখানোর সুযোগ রয়েছে। বাস্তবে অনেক প্রার্থী এর চেয়েও বেশি ব্যয় করেন। এতে দুর্বল ও কম অর্থশালী প্রার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে পড়েন, যা ভোটের মাঠে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, যখন ভোটের লড়াইয়ে ধারকর্জ ও দানের ওপর এতটা নির্ভরতা তৈরি হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে নির্বাচনের পর সেই দেনার দায় কার কাছে শোধ হবে? এটি ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
সামাজিক বিশ্লেষক তৌফিক আহম্মেদ বলেন, ভোট যেন এখন শুধু ব্যালটের নয়, অর্থের শক্তির প্রতিযোগিতা। এতে সাধারণ ভোটারের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন পর্যবেক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, রাজশাহীর ছয়টি আসনে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা আসলে দেশের সামগ্রিক নির্বাচনি বাস্তবতার প্রতিফলন। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে নয়, বরং ব্যক্তিগত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যেও।
তিনি বলেন, যারা নিজস্ব অর্থে ভোট করতে পারছেন, তারা মাঠে স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে থাকবেন। আর যারা ধার ও দানের ওপর নির্ভরশীল, তারা নির্বাচনের পর রাজনৈতিক ও নৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারেন। এতে সংসদীয় রাজনীতিতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্নটি জোরালো হয়।
আনোয়ার হোসেন আরো বলেন, নির্বাচনি ব্যয়ের সীমা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন কম। এই বৈষম্য ভোটারদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করে এবং নির্বাচনকে অসম প্রতিযোগিতায় রূপ দেয়।
রাজশাহীর আসনগুলোতে বিএনপি-জামায়াতের মুখোমুখি লড়াই যতটা রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াচ্ছে, তার চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে নির্বাচনি ব্যয় ও অর্থের উৎসের বিষয়টি। ঋণ, দান আর ব্যক্তিগত অর্থের এই সমীকরণ শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলে সেদিকেই তাকিয়ে আছে জেলার ভোটাররা বলে মনে করেন অনেকে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


সম্মানীর নামে ৫৬ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা
উত্তরায় বহুতল ভবনে আগুন, প্রাণ গেল ৩ জনের