নৌকা প্রতীকের পক্ষে সক্রিয়ভাবে ভোট করা এক আওয়ামী লীগ নেতা এখন ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাইছেন—এমন ঘটনাকে ঘিরে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
আলোচিত ওই নেতার নাম সহিদুল ইসলাম সরকার। তিনি নিশিন্দারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সুবিধাভোগের উদ্দেশ্যে পারিবারিক ব্যস্ততার অজুহাতে স্বেচ্ছায় দল থেকে পদত্যাগ করলেও পরবর্তীতে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর তিনি প্রকাশ্যেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
আওয়ামী লীগ আমলে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচনে তিনি নৌকা প্রতীকের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান রিপুর নৌকা প্রতীকের পক্ষে পাতানো রাতের ভোট খ্যাত নির্বাচনে প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
এছাড়াও জেলা পরিষদ নির্বাচন ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে ইউনিয়ন পর্যায়ে গণসংযোগ ও ভোট প্রার্থনা করেন সহিদুল ইসলাম সরকার। জেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি বগুড়া সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল ইসলাম রাজের পক্ষে প্রতিটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের কাছে ভোট চান। তবে ওই নির্বাচনে রাজ আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সৈয়দ সার্জিল আহমদ টিপুর কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হন।
পরবর্তীতে সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আবু সুফিয়ান শফিকের পক্ষে সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগে অংশ নেন। ওই সময় শফিকের আশীর্বাদে তিনি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির পদও লাভ করেন। কিন্তু ওই নির্বাচনেও শফিক আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও বগুড়া জেলা যুবলীগের সভাপতি শুভাশিষ পোদ্দার লিটনের কাছে পরাজিত হন।
এরপর কোটা আন্দোলন চলাকালে সহিদুল ইসলাম সরকার ছাত্র আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে আর্থিক সহায়তা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে গত ৫ আগস্ট জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এ সময় তার বিরুদ্ধে বগুড়া সদর থানায় একাধিক মামলা দায়ের হয় এবং একটি মামলায় তিনি কারাভোগ করেন। বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন।
জেল থেকে বের হওয়ার পর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে এখন তিনি বগুড়া সদর-৬ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চেয়ে গণসংযোগ করছেন। সম্প্রতি তারেক রহমানের নির্বাচনি জনসভায় ব্যানার হাতে মিছিলে অংশ নেওয়ার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়, যা নিয়ে ব্যাপক ট্রল ও সমালোচনা চলছে।
ভাইরাল হওয়া ছবিতে নিশিন্দারা ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির সভাপতি জাহেদুরকেও বিএনপির ব্যানারসহ মিছিলে দেখা গেছে, যা জাতীয় পার্টির রাজনীতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বলে মন্তব্য করছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে নিশিন্দারা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রাজিবুল করিম রাফি ও সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন মানিক বলেন, “আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধাভোগী সহিদুল এখন বিএনপির হয়ে ভোট চাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জুলাই শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন সুবিধাবাদিতা সাধারণ ভোটারদের মাঝে ক্ষোভ ও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।”
তারা আরও বলেন, “তিনি জুলাই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি, জেল খেটেছেন, আবার আওয়ামী লীগ আমলে প্রকাশ্যে ভোট করেছেন ও সব সুবিধা ভোগ করেছেন। একজন আওয়ামী লীগ নেতার হাতে তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত ধানের শীষের লিফলেট মাঠের ত্যাগী নেতাকর্মীদের জন্য অপমানজনক। এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।”
অভিযোগ প্রসঙ্গে সহিদুল ইসলাম সরকার বলেন, “ইউপি চেয়ারম্যান থাকার কারণে তৎকালীন পরিবেশ ও পরিস্থিতি সামাল দিতে আমাকে অনেক কিছু করতে হয়েছে। তবে আমি মনেপ্রাণে বিএনপি করি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব ছবি ভাইরাল হয়েছে, সেগুলো এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা।”
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

