শতবর্ষের সম্প্রীতি

গোদাগাড়ীতে একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দির, চলছে নামাজ-পূজা

গোদাগাড়ীতে একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দির, চলছে নামাজ-পূজা
পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির। ছবি: আমার দেশ

একই আঙিনায় পাশাপাশি দুই উপসনালয় মসজিদ ও মন্দির দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায় শান্তিপূর্ণভাবে তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছে। একদিকে নামাজ পড়ছে মুসল্লিরা, অন্যদিকে পাশেই চলেছে পূজা-উৎসব। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের উজ্জল নিদর্শন হিসাবে অনন্য দৃষ্টান্ত দেখিয়ে চলেছেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ভগবন্তপুর হাট এলাকার বাসিন্দারা।

সেখানে শত বছর ধরে একই আঙিনায় চলছে মুসলমান ও হিন্দু দুই সম্প্রদায়ের প্রার্থনা-উপাসনা। তবে এতে কোনো সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না তাদের। নিয়ম মেনেই চলছে মুসলিম ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিজ নিজ ধর্মীয় কার্যক্রম।

বিজ্ঞাপন

ভগবন্তপুর হাট ইনসান বাইতুস শরিফ জামে মসজিদ ও ভগমন্তপুর হাট সার্বজনীন গোদাগাড়ী কেন্দ্রীয় মন্দিরে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, চলতি বছর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সব থেকে বড় শারদীয় দুর্গোৎসব শুরুর পর থেকে কোনো প্রকার বাধা-বিপত্তি ছাড়াই বন্ধুত্বের বন্ধনে চলাফেরা করছেন সবাই।

আজানের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ঢাক-ঢোল ও পূজা অর্চনার শব্দ। নামাজ শেষ হলে ঢোলের শব্দে ভরে ওঠে দুর্গা মণ্ডপ। স্থানীয়রা বলছেন, প্রায় শত বছর ধরে একই আঙিনায় চলছে উভয় ধর্মের উপাসনা।

দেখা গেছে, একই আঙিনায় অবস্থিত মসজিদ থেকে মন্দিরটির দূরত্ব মাত্র ৫ মিটার। কোনো ধরনের বিভেদ ও ঝামেলা ছাড়া হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষরা যার যার ধর্ম পালন করে আসছেন।

এ সময় কথা হয় ভগবন্তপুর হাট এলাকার মইজুদ্দীন আহম্মেদ (৮০) এর সঙ্গে। তিনি বলেন, ১৯৬৬ সালে ইনসান জমিদার নামে স্থানীয় এ ব্যক্তি মন্দিরের পাশে মাটির দেওয়াল ও খড়ের চাল দিয়ে মসজিদটি নির্মাণ করেন। পাশাপাশি মসজিদ মন্দির হলেও সুশৃঙ্খলভাবে শত বছর ধরে আমরা সবাই নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছি। এখানে কখনোই কোনো বিভেদ, বিশৃঙ্খলা ঘটেনি। সব সময়ই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় থাকে।

গোদাগাড়ী কেন্দ্রীয় মন্দিরে সভাপতি শ্রী শান্ত কুমার মজুমদার বলেন, মন্দিরের বয়স শত বছরেরও বেশি আমার দাদা আদ্যনাথ মজুমদার বৃটিশ আমলে এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। আমরা আমাদের পূজার উৎসবে সময়মতো পূজা করি, ওরা সময়তো নামাজ-কালাম করে। এখানে আমরা সবাই মিলিতভাবে বসবাস করি।

ইনসান বাইতুস শরিফ জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মো.শাহালাল বলেন, ইনসান বাইতুস শরিফ জামে মসজিদের পাশেই রয়েছে ঐতিহ্যবাহী মন্দির। মসজিদের আগে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবুও এখানে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবশ্রেণীর মানুষ যার যার ধর্ম পালন করে। এখানে কোনো বিশৃঙ্খলাও হয় না। পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির হলেও কোনো ঝামেলা নেই। আমাদের আজান হলে নামাজ পর্যন্ত তারা তাদের ঢাক-ঢোল বন্ধ রাখে।

অধীর চন্দ্র বলেন, প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় মুসলিমদের অনেক সহায়তা পেয়ে থাকি আমরা। আমাদের মন্দিরের পাশে একটি মসজিদ রয়েছে। আমরা সবাই তাদের সঙ্গে মিলিতভাবে বসবাস করে আসছি। মসজিদে যখন আজান ও নামাজের সময় হয় তখন আমাদের বাদ্যযন্ত্র আমরা বন্ধ রাখছি। আমরা সবাই একে অপরের ভাইয়ের মতো বসবাস করছি। তবে সরকারিভাবে যদি শতবর্ষী মন্দিরটির উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া হয় তবে অনেকটাই উপকার হবে বলে জানান স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

মন্দিরটির পুরোহিত পলাশ প্রতিম মজুমদার বলেন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের যে বিষয়টি আছে এখানে যথেষ্টভাবে সেই বিষয়টা ফুটে উঠেছে।

এ বিষয়ে গোদাগাড়ী পৌরসভার সাবেক মেয়র আনোয়ারুল চৌধুরী বলেন, আমাদের এখানে পাশাপাশি অবস্থিত মসজিদ-মন্দিরে উভয় ধর্মের মানুষেরা তাদের ধর্ম পালন করে থাকেন। আজ পর্যন্ত আমাদের এখানে উভয়পক্ষের মধ্যে কোনো ঝগড়া-বিভেদের ঘটনা ঘটেনি। একে অপরকে সহায়তা করে তাদের ধর্মীয় আচার- রীতি পালন করে আসছে। আমরা গর্বিত যে, দীর্ঘদিনের বাপ-দাদার এই রেওয়াজ ধরে রাখতে পেরেছি।

গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান বলেন, পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিজ নিজ ধর্ম পালন করছে দুটি ধর্মের মানুষ। এমন সম্পর্ক এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও বন্ধুত্বের পরিচয় বহন করে। এবারের দুর্গাপূজা উপলক্ষে ৪২টি মন্দিরে পূজামন্ডপে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে তথ্য দেন তিনি।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন