বালু অপসারণের নামে কেটে নেওয়া হচ্ছে ফসলি জমি

বালু অপসারণের নামে কেটে নেওয়া হচ্ছে ফসলি জমি

সিরাজগঞ্জে নদী খননের স্তূপকৃত বালু অপসারণের নামে প্রকাশ্য দিবালোকে কেটে নেওয়া হচ্ছে কৃষকের ফসলি জমি ও বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। নিলামের শর্ত ভঙ্গ করে ড্রেজার দিয়ে ৫০ থেকে ৭০ ফুট গভীর করে এই মাটি ও বালু উত্তোলনের ফলে একদিকে যেমন হারিয়ে যাচ্ছে আবাদি জমি, অন্যদিকে তীব্র নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে স্থানীয় বসতভিটা ও জনবসতি। বছরের পর বছর ধরে চলা এই অনিয়ম বন্ধে প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও মিলছে না কোনো স্থায়ী সমাধান।

মূলত সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলার নদ-নদীর নাব্য বৃদ্ধি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদীভাঙন রোধে ‘বাঙ্গালী-করতোয়া-ফুলজোর-হুরাসাগর নদী সিস্টেম ড্রেজিং ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়েছিল। ২০২১ সাল থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের ড্রেজিংয়ের বালু নদীর পাড়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন ও খাস জমিতে স্তূপ করে রাখা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, স্তূপকৃত বালুর ৫০ শতাংশ জমির মালিকদের এবং বাকি অর্ধেক রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই বালু ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন না করে ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়ার শর্তে জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে নিলাম করা হয়।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু প্রকল্পের সুফল পাওয়ার বদলে বালু অপসারণ ঘিরে শুরু হয়েছে চরম নৈরাজ্য। সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ ও উল্লাপাড়া উপজেলার ঝাটিবেলাই, আলোকদিয়া ও বড়হর এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, নদীরপাড়জুড়ে তৈরি হয়েছে বিশাল সব গর্ত। ড্রেজারের পাইপ দিয়ে অবিরাম তুলে আনা হচ্ছে বালু। একসময় যেখানে ফসলের মাঠ ছিল, এখন সেখানে গভীর জলরাশি। নিলামের শর্ত অনুযায়ী স্তূপের বালু সরানোর কথা থাকলেও, প্রভাবশালী চক্রটি নতুন করে ড্রেজিং করে নদীরপাড় ও কৃষিজমি সাবাড় করছে। অবৈধভাবে উত্তোলিত এই বালু নিয়ে দিন-রাত ফুলজোর নদীতে অবাধে চলাচল করছে ভলগেট ও বাল্কহেড নৌযান। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে ঝাটিবেলাই, চর নুরনগর, আলোকদিয়া ও বড়হরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। কৃষিজমি হারানোর পাশাপাশি শেষ আশ্রয়টুকু নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন হাজারো মানুষ। স্থানীয় ভুক্তভোগী লোকমান হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এত গভীরভাবে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে যে আমাদের বেঁচে থাকতে সেখানে আর কোনোদিন চাষাবাদ করা সম্ভব হবে না। থানায় অভিযোগ দিয়েও লাভ হয় না, প্রশাসন কয়েকদিন বন্ধ রাখলে পরে আবার কাটা শুরু হয়।’ অপর বাসিন্দা শাহ আলম জানান, মাটি কাটার প্রতিবাদ করলে উল্টো ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং রাতের অন্ধকারে কাটার উৎসব আরো বেড়ে যায়।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া এবং নিয়মভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই তিনটি স্থানের বালু অপসারণের নিলাম বর্তমানে সম্পূর্ণ অকার্যকর ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে সেখান থেকে নতুন করে বালু বা মাটি উত্তোলনের আর কোনো আইনি সুযোগ নেই।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ‘ঝাটিবেলাইসহ সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো থেকে এখন আর বালু অপসারণের সুযোগ নেই।

যখনই অবৈধভাবে বালু বা মাটি উত্তোলনের খবর পাচ্ছি, তখনই উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় আমরা অভিযান চালাচ্ছি। আমাদের পক্ষ থেকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা অব্যাহত রয়েছে।’

প্রকল্পের উদ্দেশ্য সফল করতে এবং নদীপাড়ের মানুষদের বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে এই অবৈধ খনন স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, ক্ষতিগ্রস্ত জমি রক্ষা এবং জড়িত প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন