কালবৈশাখি ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক ঘরবাড়ি, ফসলি জমি এবং কলা গাছে ভেঙে পড়েছে।
নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, নওগাঁয় আগাম কালবৈশাখি ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে কলা, ভুট্টা, গম, আলু ও শাকসবজিসহ ৭৩১ দশমিক ৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতির মুখে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কলা বাগানের।
গত রোববার জেলার ১১টি উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রায় ৩০ মিনিটের ঝড়ো বৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠার পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে চাষিদের পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কালবৈশাখি ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ২২৫ হেক্টর জমির কলা, ২১৬ হেক্টর জমির ভুট্টা, ২১৬ হেক্টর জমির গম, ২৫ হেক্টর জমির আলু এবং ৪৯ দশমিক ৫ হেক্টর জমির বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির ক্ষতি হয়েছে। এরমধ্যে প্রায় ১৬৭ কোটি টাকার কলা এবং ৫ কোটি ৮৩ লাখ ২০ হাজার টাকার ভুট্টা পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলার বিভিন্ন মাঠ ও বাগান ঘুরে দেখা গেছে, কালবৈশাখি ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে কলা, পেঁপে, ভুট্টা, গম, আলু ও শাকসবজিসহ বিভিন্ন ধরনের ফসলের গাছ মাটিতে পড়ে রয়েছে। কলা বাগানগুলোর অধিকাংশ গাছের মাথা বাতাসে ভেঙে পড়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ কলাই পরিপক্ব হতে শুরু করেছিল। যা আর এক সপ্তাহ থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই কৃষকের ঘরে উঠার কথা ছিল। পেঁপে গাছের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। অনেক জমির গমের শীষ ভেঙে হেলে পড়েছে। হেলে পড়েছে ভুট্টার গাছগুলোও। বদলগাছী উপজেলার বালুভরা ইউনিয়নের কুমারবাড়ি গ্রামের কলাচাষি জুয়েল রানা বলেন, গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় এবার প্রায় ছয় বিঘা জমিতে কলার বাগান করেছি। এক রাতের কালবৈশাখি ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে আমার বাগানের অর্ধেকেরও বেশি গাছ ভেঙে পড়েছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়নের চুনিয়াগাড়ী গ্রামের কৃষক আহসান হাবিব বলেন, ঘূর্ণিঝড়ে আমার দুই বিঘা জমির গম হেলে পড়েছে। এসব গমের শীষ মাত্র পরিপক্ব হওয়ার পথে। এ সময়ে প্রাকৃতিক এ দুর্যোগ সব লন্ডভন্ড করে দিল।
সোমবার বিকালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নওগাঁর উপপরিচালক হোমায়রা মণ্ডল বলেন, রোববার রাতের ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে যেসব জমির কলা, ভুট্টা এবং পেঁপে আক্রান্ত হয়েছে, সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া আর সম্ভব নয়। জেলার সব উপজেলা থেকে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করতে আমাদের কিছুটা সময় লেগেছে।
বদলগাছী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের উচ্চ পর্যবেক্ষক মাহবুবুল বলেন, রোববার রাত ১০টা থেকে প্রায় ৩০ মিনিটের ঝড়ে নওগাঁয় ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫০ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হয়। একই সময়ে রাত ১০টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মোট ২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
নালিতাবাড়ী (শেরপুর) প্রতিনিধি জানান, শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে ঝড়-শিলাবৃষ্টি, ঘরবাড়ি-গাছপালা বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে ৩৫ পরিবার খোলা আকাশের নিচে নিরাপত্তাহীন জীবনযাপন করছেন।
জানা গেছে, শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে গত শনিবার রাতে ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি, গাছপালা। বেশকিছু এলাকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। অনেকের ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে খোলা আকাশের নিচে রয়েছেন। তবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রূপনারায়ণকুড়া ইউনিয়নের সিঙ্গুয়ারপাড় গ্রামে।
নালিতাবাড়ী শহরে ধসে পড়ে বাসাবাড়ির ইটের বাউন্ডারি দেয়াল। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রূপনারায়ণকুড়া ইউনিয়নের সিঙ্গুয়ারপাড়া গ্রাম। এ গ্রামের প্রায় ৩০-৩৫ বাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। অনেকের বাড়ির টিন গাছের ডালে, এমনকি পাশের গ্রামে পর্যন্ত উড়ে গেছে। ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকে খোলা আকাশের নিচে রয়েছেন। দিনমজুর মফিজুল ইসলাম বলেন, ইফতারের দাওয়াতে সপরিবারে তিনি অন্য জায়গায় গিয়েছিলেন। ৮টার দিকে ঝড় ও বৃষ্টি শুরু হলে তারা আত্মীয় বাড়িতে আটকা পড়েন। ঝড়-তুফান শেষ হওয়ার পর বাড়ি ফিরে দেখেন ঘরবাড়ি ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে গেছে। এখন তার মাথা গোঁজার ঠাঁই পর্যন্ত নেই।
স্থানীয়রা জানান, এমন ঝড়ের কবলে তারা কখনো পড়েননি। হঠাৎ করে ঝড় এসে সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে গেছে।
ইউপি চেয়ারম্যান মঞ্জুর আল মামুন জানান, খবর পেয়ে বিকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় বিষয়টি ইউএনওকে জানানো হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মশিউর রহমান জানান, শিলাবৃষ্টিতে বোরো আবাদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে সবজি ও ভুট্টার কিছুটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

