আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

চাহিদা বাড়ছে নাটোরের হাতে ভাজা মুড়ির

আব্দুস সালাম, নাটোর

চাহিদা বাড়ছে নাটোরের হাতে ভাজা মুড়ির

সারা দেশেই বাড়ছে নাটোরের সদর উপজেলার গ্রামের হাতে ভাজা বিষমুক্ত মুড়ির চাহিদা। রমজান মাসের এ সময়টায় বেড়ে যায় বিষমুক্ত হাতে ভাজা মুড়ির কদর কয়েক দ্বিগুণ। ধান সংগ্রহ থেকে শুরু করে মুড়ি ভাজা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি নিজস্ব পদ্ধতিতে সম্পন্ন করে। সমস্ত প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের রাসায়নিক বা ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করা হয় না। এ কারণেই স্থানীয়রা একে ‘বিষমুক্ত মুড়ি’ নামে চেনেন। তবে বর্তমানে সারা দেশে মেশিনে মুড়ি ভেজে কম দামে বাজারজাত করায় কমছে এসব হাতে ভাজা মুড়ির কদর। হারাচ্ছে বাজার।

জানা গেছে, নাটোর সদরের কৃষ্ণপুর, বাকসোর, গোয়ালদিঘী, বারুইহাটিসহ চার-পাঁচটি গ্রামের প্রায় দুইশতাধিক পরিবার চার দশক ধরে এ পেশাকে আঁকড়ে ধরে সংসার চালাচ্ছেন। রমজান মাসে গভীর রাত থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত চুলার আগুনে চলে মুড়ি ভাজা। কোনো ধরনের রাসায়নিক বা ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার না করায় এ মুড়ির চাহিদা বেশি। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলালেও বদলায়নি তাদের পরিশ্রম আর ঐতিহ্যবাহী মুড়ি ভাজার ধারা। মুড়ি কারিগর আরিফা বেগম বলেন, প্রথমে ভালো মানের ধান বাছাই করে রোদে শুকানো হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময় ভিজিয়ে রেখে সিদ্ধ করে শুকিয়ে নেওয়া হয়। তারপরে চাল বানিয়ে গরম বালুর মধ্যে চালের সঙ্গে পরিমাণ মতো লবণ মিশিয়ে ভেজে তৈরি করা হয় মুড়ি। বছরের অন্যান্য সময় ব্যস্ততা একটু কম থাকে। কিন্তু রোজার মাসে দম ফেলার সময় পাওয়া যায় না। পরিশ্রম হিসেবে লাভ কম। আরেক কারিগর আব্দুল মোমিন বলেন, মুড়ি বিক্রয়ের জন্য সদর উপজেলার ডাল সড়ক এলাকায় গড়ে উঠেছে পাইকারি বাজার। এসব মুড়ি নাটোর শহরসহ আশপাশের বিভিন্ন হাট-বাজারে সরবরাহ করা হয়। বিশেষ করে রমজান মাস ও বিভিন্ন উৎসবকে ঘিরে চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তবে বাড়তি জ্বালানি খরচ, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং আধুনিক যন্ত্রচালিত উৎপাদনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এসব চ্যালেঞ্জের কথাও জানিয়েছেন তারা। ব্যবসায়ী সোহেল রানা জানান, বাপ দাদার আমল থেকে তারা এ মুড়ি ভাজা ও বিক্রির কাজ করেন। বর্তমানে এ ব্যবসার যে অবস্থা তাতে আর লাভ হয় না। এখন ধানের দামসহ কামলার খরচ অনেক বেশি। নিজেরাই কামলার কাজ করেন । তাই কোনো রকমে টিকে আছেন। কিন্তু খরচ হিসেবে মুড়ি বিক্রি করে তাদের লাভ নেই। আরেক ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ধানের দাম অনেক বেশি । তাই তাদের লাভ নেই। মুড়ি বিক্রি করি প্রতি মণ ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা। কিন্তু এবার প্রতি মণ ধান কিনছেন ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। কিন্তু মুড়ির দাম বাড়েনি। মুড়ির পাইকারি ক্রেতা আফজাল হোসেন জানান, গ্রাম থেকে আসা হাতে ভাজা মুড়ি কেনাবেচার জন্য নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের পাশের ডাল সড়কে শুধু মুড়ি বাজার গড়ে উঠেছে। এ বাজার থেকে মুড়ি কিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। মুড়ি ব্যবসায়ী গোলজার হোসেন জানান, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রশিক্ষণ পেলে কৃষ্ণপুরের এ মুড়ি শিল্প আরো সম্প্রসারিত হতে পারে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পেলে গ্রামীণ এ শিল্প নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। মুড়ি বাজারের আড়তদার মিলন হোসেন জানান, অন্য সময় প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০ মণ মুড়ি আড়তে আসলেও রোজার মাসে গড়ে প্রতিদিন আড়তে ৭০ থেকে ৮০ মণ হাতে ভাজা মুড়ি আমদানি হয়। রাজধানীসহ অন্য বড় শহরের ক্রেতাদের কাছেও বেশ কদর হাতে ভাজা মুড়ির। বিদ্যমান সমস্যা ও সরবরাহ জটিলতা কাটাতে পারলে সারা বছরই নিরাপদ এ খাদ্যদ্রব্যটি সরবরাহ সম্ভব বলে মনে করেন কারিগর ও ব্যবসায়ীরা।

বিজ্ঞাপন

নাটোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ আদনান জানান, ‘বিষমুক্ত মুড়ি ঐতিহ্য ধরে রাখতে মুড়ি কারিগরদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসহ মুড়ির বাজারজাত সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্থানীয়রা মনে করেন, চার দশকের বেশি সময় ধরে আগুনের তাপে ঘাম ঝরিয়ে গড়ে ওঠা কৃষ্ণপুরের বিষমুক্ত মুড়ি আজ শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়, বরং একটি গ্রামের টিকে থাকার গল্প। বাজারে যন্ত্রচালিত কারখানার মুড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতা তাদের জন্য বড় বাধা। দীর্ঘ চার দশক বছরের শ্রম ও সততার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এ গ্রামীণ উদ্যোগ এখন শুধু একটি পেশা নয়, বরং পুরো গ্রামের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন