বগুড়ায় সার ডিলার নিয়োগকে ঘিরে শুরু থেকেই অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। সিটি করপোরেশন ও ১৩ উপজেলায় ১৫৮ জন ডিলার নিয়োগের জন্য আবেদন করেছিলেন ১,২৬৬ জন। তবে যাচাই-বাছাই শেষে আট শতাধিক আবেদনকারীকে বাদ দেওয়া হলেও কী কারণে তাদের আবেদন বাতিল করা হয়েছে—সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
বাদপড়া আবেদনকারীদের অভিযোগ, বাছাই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ছিল না। তাদের দাবি, আবেদনকারীদের বড় একটি অংশ রাজনৈতিক নেতাকর্মী হলেও প্রকৃত ব্যবসায়ীর সংখ্যা পাঁচ শতাংশেরও কম। ডিলারশিপ পেতে এখন অনেকেই মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও জেলা পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশের জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন।
একাধিক আবেদনকারী অভিযোগ করেন, উপজেলা পর্যায়েই আগাম একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল। সে তালিকার বাইরে থাকা অনেককে যাচাই-বাছাইয়ের নামে বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি অর্থের বিনিময়ে প্রভাবশালীদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও উঠেছে উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে।
দেশে সার সংকট মোকাবিলার লক্ষ্যে প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় একজন করে সার ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে আবেদনকারীদের কাছ থেকে দুই হাজার টাকা অফেরতযোগ্য আবেদন ফি এবং ১০ হাজার টাকা ফেরতযোগ্য জামানত নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে যাচাই-বাছাই কমিটিতে জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি ও বগুড়া সদর বিএনপি সভাপতি মাফথুন আহমেদ খান রুবেল বলেন, গত বৃহস্পতিবার জেলা কার্যালয়ে আদমদীঘি উপজেলা থেকে একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া সিটি করপোরেশনে এক পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছে ১৬টি। বগুড়া সদরের ১১ পদের জন্য ৭৪টি, শাজাহানপুরে ৯টির জন্য ১১৪টি, শেরপুরে ১১টির জন্য ১১৮টি, ধুনটে ১৩টির জন্য ১৬৪টি, গাবতলীর ১৯টির জন্য ১৬২টি, সারিয়াকান্দির ২১টির জন্য ১৬৩টি, সোনাতলার আটটির জন্য ৮১টি, শিবগঞ্জের ১৬টির জন্য ৪৯টি, মোকামতলা (নবগঠিত) এলাকার ১৮টির জন্য ৩৭টি, কাহালুর ১০টির জন্য ১০০টি, দুপচাঁচিয়ার আটটির জন্য ৭২টি, আদমদীঘির সাতটির জন্য ৬২টি এবং নন্দিগ্রামের ছয় পদের বিপরীতে ৫৪টি আবেদন জমা পড়ে।
আবেদনকারীদের অভিযোগ, উপজেলা পর্যায়ে যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিটি পদের বিপরীতে তিনজনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা জেলা কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় বহু তৃণমূল কর্মী ও আবেদনকারী বাদ পড়েছেন। কারা কীসের ভিত্তিতে তালিকায় স্থান পেয়েছেন, সে বিষয়েও কোনো স্বচ্ছতা নেই বলে অভিযোগ করেন তারা।
সার ডিলার নিয়োগে ১২ সদস্যের জেলা কমিটিতে রয়েছেন জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, যুগ্ম পরিচালক (সার), উপপরিচালক (বীজ বিপণন), বিসিআইসি বাফার গুদামের ইনচার্জ, বগুড়া সদর বিএনপি সভাপতি মাফতুন আহমেদ খান রুবেল, চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ সভাপতি এবং কৃষক দল নেতা এনামুল হক সুমন।
কমিটির সদস্য এনামুল হক সুমন বলেন, উপজেলা কমিটিগুলো প্রতিটি পদের বিপরীতে তিনজন করে প্রার্থী বাছাই করে জেলা কমিটিতে পাঠিয়েছে। জেলা কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে গত ২৪ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত তালিকা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।
এদিকে ধুনট উপজেলার এক আবেদনকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা আবেদন করেছি। এখন কর্মী হয়ে নেতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি; কিন্তু কেউ কোনো গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
শেরপুর উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের মোশারফ হোসেন, আব্দুস ছালাম, শাহবন্দেগী ইউনিয়নের আব্দুল হাই সিদ্দিকী হেলাল এবং সুঘাট ইউনিয়নের রনি খন্দকার জানান, তারা সার ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেছেন। পরে জানতে পারেন, গত বৃহস্পতিবার জেলা কমিটি কৃষি মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্ত তালিকা পাঠিয়েছে। তবে তারা এখনো জানেন না যাচাই-বাছাইয়ে তাদের আবেদন টিকেছে, নাকি বাতিল হয়েছে।
আদমদীঘি উপজেলার বিএনপি নেতা টিকন অভিযোগ করে বলেন, এমপির সুপারিশ ছাড়া কেউ কারো কথা শোনে না। সাতটি পদের প্রতিটিতেই এমপির কোটা রয়েছে বলে শুনেছি। তাহলে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের স্থান কোথায়?’
একই ধরনের অভিযোগ করেন সারিয়াকান্দি উপজেলার বিএনপি নেতা নূর আজম বাবু। তিনি বলেন, এমপির সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। কারা যাচাই-বাছাইয়ে বাদ পড়েছেন, সেটিও জানানো হয়নি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জেলা কমিটির সদস্য সচিব ও উপপরিচালক সোহেল শামসুদ্দিন ফিরোজ বলেন, উপজেলা থেকে পাঠানো তালিকা যাচাই-বাছাই শেষে গত বৃহস্পতিবার কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, তালিকা নিয়ে বেশ কিছু আপত্তি উঠেছিল। প্রতিদিনই বিভিন্ন নেতার তদবির আসছিল। সে কারণেই পুরো প্রক্রিয়াটি গোপনে সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে প্রতিটি উপজেলায় সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যরা বিষয়টি তদারকি করেছেন।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, প্রায় প্রতিটি উপজেলাতেই যাচাই-বাছাই পর্বে কম-বেশি অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক তৌফিকুল ইসলাম ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন কমিটির সদস্য সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


