সাংবাদিক আশরাফ কায়সারের জবানবন্দি

একদলীয় শাসন কায়েম করে দেশের গতিপথ বদলে দেয় আ.লীগ

একদলীয় শাসন কায়েম করে দেশের গতিপথ বদলে দেয় আ.লীগ
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার। ছবি: সংগৃহীত

স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা হোঁচট খায়। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রচেষ্টাকে সরকার বিরোধিতা হিসাবে গণ্য করতে থাকে। জাসদ ও সর্বহারা পার্টিকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়। পাশাপাশি রক্ষী বাহিনীর মত এলিট ফোর্স সারা দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন অজুহাতে নির্যাতন ও হত্যা করতে থাকে। ১৯৭৩ সালের ১ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যখন ব্যাপক কারচুপি করে ভিন্ন মতের প্রার্থীদের হারিয়ে আওয়ামী লীগের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সরকার দেশের সরকারের চেয়ে দলীয় সরকারের চেহারায় আবির্ভূত হয়। ফলে দেশব্যাপী অরাজকতা, দুর্নীতি ও দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা করে। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফ্যাসিজম গভীরভাবে প্রোথিত। স্বাধীন দেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদের পূজারি এবং একদলীয় শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন করে স্বাধীন রাষ্ট্রের গতিপথকে বদলে দেয় আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর হাসিনার শাসনব্যবস্থাও ছিল মুজিবের শাসনের ধারাবাহিকতা।

রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার।

বিজ্ঞাপন

জুলাই বিপ্লবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ আসামির বিরুদ্ধে ২৭তম সাক্ষী ‍হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।

জবানবন্দিতে আশরাফ কায়সার বলেন, আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রবণতা ১৯৭২ সাল থেকে শুরু হয়। মেজর এম এ জলিলকে কোনো প্রকার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, তাকে আটক করা হয় এবং মিথ্যা মামলায় সাজা দেওয়া হয়। সরকারি বাহিনী পিছন থেকে গুলি করে সাভারে ১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারি সিরাজ সিকদারকে হত্যা করে। সেদিন পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, কোথায় সিরাজ সিকদার। বস্তুত এই বক্তব্যের মাধ্যমে সিরাজ সিকদার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তিনি তার ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা প্রকাশ করেছিলেন।

৭২-৭৫ এ আমরা আওয়ামী লীগের শাসন ব্যবস্থা থেকে বুঝতে পারি দলটির রাজনৈতিক চরিত্র কি, তা হচ্ছে ভিন্ন মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা। বিরোধী মত দমনে সরকারি বাহিনী পুলিশ ও রক্ষী বাহিনীর পাশাপাশি অক্সিলারি ফোর্স হিসাবে আওয়ামী লীগ, শ্রমিকলীগ, লালবাহিনী ও বিশেষভাবে আওয়ামী যুবলীগকে ব্যবহার করা হয়। যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা এবং শেখ মুজিবুর রহমানের পরে যাকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে ভাবা হত শেখ ফজলুল হক মনিকে। সে ১৯৭৩ সালের জুন মাসে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তিনি প্রয়োজনে রাজনীতিতে ভায়োলেন্সে বিশ্বাসী। এ থেকে দলটির ভিতরে সহিংস রাজনীতির দিকে ঝোঁক পরিষ্কার বোঝা যায়, যা গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে একেবারেই মানানসই নয়।

একই ফ্যাসিবাদী প্রবণতা আমরা দেখতে পাই ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরে শেখ হাসিনার শাসন আমলের শুরু থেকে। সারা দেশে গুম, খুন, আয়না ঘর প্রতিষ্ঠা করে রাজনৈতিক ভিন্ন মত দমন করা শুরু হয়। ২০০৯ সালে পিলখানা হত্যাকাণ্ড একটি পরিকল্পিত ঘটনা যা বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী ও সামরিক বাহিনীকে দুর্বল করা এবং রাষ্ট্রের স্থিতি নষ্ট করার প্রচেষ্টা। আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গ সংগঠনের অনেক নেতৃবর্গ এই হত্যাকাণ্ডের পটভূমি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিলেন। বিডিআরের ডিজি জেনারেল শাকিল নিহত হওয়ার কয়েক মিনিট আগে কিংবা পরে খবরটি প্রথম আমরা জানতে পারি ভারতীয় মিডিয়া এনডিটিভি এর সংবাদ থেকে। ওই একই সময়ে বাংলাদেশের একজন নারী সাংবাদিক মুন্নী সাহা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা সরাসরি সম্প্রচার করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে কথিত বিদ্রোহের ঘটনা সরাসরি সম্প্রচারের প্রথম দৃষ্টান্ত এটি। প্রশ্ন হচ্ছে তিনি কি করে ওই সময়ে ঘটনাস্থল পিলখানায় হাজির হলেন? ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ প্রচার ও তার হাজির হওয়া এবং এ দেশের ভারতীয় গোয়েন্দা এর সম্পৃক্তি অনেকেই চাইলে খুঁজতে পারেন।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর আমরা গুম, খুন ও আয়না ঘরের প্রবণতা দেখতে পাই। পরবর্তীতে ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমসহ অনেক ভিন্ন মতের রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী কে গুম হতে দেখি। ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে ভিন্ন মতের সমাবেশে দমনপীড়ন করা হয় ও ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালিয়ে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তা আড়াল করা হয়। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করেন।

২০১৪ সালে ওই নির্বাচন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বর্জন করে ১৫৩ জন আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পথ রুদ্ধ করে। ঠিক ৭২-৭৫ এর সময়ের মত আওয়ামী লীগ সরকার ধীরে ধীরে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার দিকে পুনরায় যেতে থাকে। বিরোধী রাজনীতির উপর দমন-পীড়ন, ভিন্ন মতের মানুষকে হেনস্তা করা এবং শেখ হাসিনা ছাড়া কোন বিকল্প নেই এমন একটি বয়ান সংস্কৃতি অঙ্গনের ব্যক্তিবর্গ ও গণমাধ্যমের ভিতর দিয়ে দেশব্যাপী প্রচার শুরু হয়। ঠিক যেমন ‘মুজিববাদ’ হয়েছিল ৭২-৭৫ সালে, তারা তেমন করে হাসিনাবাদ প্রচার করতে থাকে। ইতোমধ্যে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে কার্যক্রমহীন হতে দেখি। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ ও ২৪ সালে কারচুপির নির্বাচন করে ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকে। দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরা দলীয় কর্মীদের মত আচরণ করতে থাকে এবং গণভবন সাংবাদিকতা বলে একটি জন বিচ্ছিন্ন ‘স্তুতির সাংবাদিকতা’ শুরু হয়। যারা শেখ হাসিনাকে বলতেন প্রশ্ন নয়, প্রশংসা করতে এসেছি। অথচ সাংবাদিকতার একটিই কাজ তা হচ্ছে প্রশ্ন করা। ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট এর মত কালো আইন করে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করা হয়।

জবানবন্দিতে সাংবাদিক কায়সার বলেন, ২০১০ সাল থেকে জঙ্গি, রাজাকার ইত্যাদি তকমা দিয়ে মানুষকে হেয় করা ও বিরোধী মত দমনের কৌশল বেছে নেয় সরকার। সেসময় আমরা দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি নাটকের মাধ্যমে মানুষ খুন করতে দেখতে পাই। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বকে দেখানোর চেষ্টা করা হয় যে, শেখ হাসিনার অবৈধ শাসন না থাকলে দেশ জঙ্গিদের হাতে চলে যাবে। বিচার বিভাগ, পুলিশ বিভাগ, বেসামরিক প্রশাসন সম্পূর্ণভাবে আওয়ামী লীগের আজ্ঞাবহ হয়ে পড়ে। পুলিশ, বিচারক, প্রশাসনের কর্মকর্তা নিয়োগ ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনা ও ক্যাডারদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সারা দেশে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপন করা হয় এবং পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাস বিকৃতি করে তাকে দলীয় বয়ানে পরিণত করা হয়। দেশের সর্বত্র মুজিব কর্ণার স্থাপন করা হয়। মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা অতীতের বিষয়ে পরিণত হয়।

এই প্রেক্ষাপটেই ২০২৪ সালের জুলাই-আগষ্টের গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। আন্দোলন দমনে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, স্বেচ্ছাসেবকলীগ প্রধান বাহাউদ্দিন নাছিম, মুখপাত্র মোহাম্মদ এ আরাফাত, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকগণ ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংঘটনে তাদের অধীনস্থদের প্ররোচিত করেন। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, ছাত্রদের আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগই যথেষ্ট। এই বক্তব্যের পরদিনই আমরা দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ও শহরগুলোতে ছাত্র তরুণদের উপর বিশেষ করে নারীদের উপর ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী আক্রমণ দেখতে পাই। ওবায়দুল কাদের ও ১৪ দলীয় জোটের নেতারা গণমাধ্যমের সামনে ছাত্রদের উপর আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর "শুট এট সাইট" এর ঘোষণা দেন, যা জীবনঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার নিশ্চিত করে। শেখ হাসিনা দ্বারা নির্দেশিত হয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ এ আরাফাত, নিখিল, পরশ, সাদ্দাম ও ইনান তাদের অধীনস্থ কর্মীদের ছাত্র অভ্যুত্থান দমনে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের বারংবার নির্দেশনা প্রদান করেন। ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় এসব ব্যক্তিবর্গের সরাসরি উপস্থিতি, আন্দোলনকারীদের উপর গুলি বর্ষণ, সহিংস আক্রমণের অনেক ভিডিও ফুটেজ আমরা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সূত্রে দেখতে পাই। সরকারি বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের অক্সিলিয়ারি ফোর্স হিসাবে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ, শ্রমিকলীগ এমনকি সৈনিকলীগ ও শিশুলীগ কে আমরা ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটাতে দেখি যদিও ইন্টারনেট শাটডাউন করে সরকার এসব ঘটনা আড়াল করতে চেষ্টা করেছিল। জাতিসংঘের রিপোর্টেও পুলিশের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের মিলিশিয়াদের আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বিবৃত হয়েছে। ২০২৪ সালে একটি রাজনৈতিক দলের ফ্যাসিবাদী ও সহিংস চরিত্র আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনগুলো ফুটিয়ে তোলে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য এটি একটি ভয়াবহ ঘটনা। এ ধরনের ফ্যাসিবাদী শক্তি এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকার একসঙ্গে চলতে পারে না। জুলাই অভ্যুত্থানে প্রায় ১৪০০ মানুষের জীবন দান ও ২৫০০০ মানুষের অঙ্গহানি এবং অসংখ্য সহিংস ঘটনার জন্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলোকে রাজনীতির পরিমণ্ডলে রাখার ব্যাপারে একটি নতুন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে, যাতে দেশ আর কখনোই ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা ও সহিংস রাজনীতিতে ফিরে যেতে না পারে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের দায়ভার পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতো বটেই কিন্তু তাদের সুপ্রিম কমান্ডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশের আইজিপি, র‍্যাবের প্রধান, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ এ আরাফাত, নিখিল, পরশ, সাদ্দাম ও ইনানসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের সকল জ্বরের নেতাদের দায় রয়েছে এবং এর সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় দেশ আইনের শাসনের বাহিরে অবস্থান করবে এবং পুনরায় গণবিরোধী ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা ফিরে আসবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন