খুলনা জেলা পরিষদ

অবৈধ মার্কেট নির্মাণ করে হাতিয়ে নেওয়া হয় কোটি টাকা

অবৈধ মার্কেট নির্মাণ করে হাতিয়ে নেওয়া হয় কোটি টাকা
চুকনগরে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনামলে অবৈধভাবে দুই মার্কেট নির্মাণ করে হাতিয়ে নেওয়া হয় কোটি কোটি টাকা। ছবি: আমার দেশ

খুলনার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যক কেন্দ্র চুকনগর। সেখানে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনামলে অবৈধভাবে দুটি মার্কেট নির্মাণ করে হাতিয়ে নেওয়া হয় কোটি কোটি টাকা। আইন লঙ্ঘন করে জেলা পরিষদের জায়গায় নির্মিত এই মার্কেট নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়িক এই বিরোধের জের পড়েছে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতেও। প্রকাশ্য সংঘাত, দল থেকে বহিষ্কার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরস্পরের প্রতি বিষোদ্গার সার্বিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

বিজ্ঞাপন

এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের এক পক্ষের দাবি, সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রকৃতদের ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হোক। অপর পক্ষের দাবি, প্রকাশ্যে ও গোপনে মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে তারা দোকান বরাদ্দ নিয়েছেন। তাই মার্কেট ভেঙে দিলে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়বেন।

এ বিষয়ে চুকনগর বাজার বণিক সমিতির পক্ষ থেকে সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্য (খুলনা-৫) এবং খুলনা বিভাগীয় কমিশনারকে পৃথক স্মারকলিপি দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, ১৯৪১ সালে বাজারের উত্তর প্রান্তে ভদ্রা নদীর তীরে নির্মিত ডাকবাংলোর সামনে ৫৬ শতক জমিতে ফাঁকা মাঠ ছিল। ডাকবাংলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় ২০২০ সালে জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হারুনর রশিদের সিদ্ধান্তে ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। এরপর সেখানে সাবেক ভূমিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের ঘনিষ্ঠ অনুসারী জয়দেব আঢ্য ও ইন্দ্রজিত দেবের নিজস্ব অর্থায়নে পাকা ছাদযুক্ত একটি মার্কেট নির্মাণ করা হয়। সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জমিতে একসনা বরাদ্দ নিয়ে পাকা স্থাপনা নির্মাণ ভূমি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১৭-এর ৭ অনুচ্ছেদের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।

এর আগে জেলা পরিষদ ৮৮ জনকে বরাদ্দপত্র দেয়, যাদের মধ্যে সিংহভাগ ওই দুই ব্যক্তির পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন এবং দোকান কর্মচারী। তালিকায় জেলা পরিষদের ১১ জন নির্বাচিত সদস্যের নামও রয়েছে। ৮৮ জনকে বরাদ্দ দেওয়া হলেও দোকান নির্মাণ হয়েছে ১২৬টি। এরপর দোকানগুলো অবস্থান ও গুরুত্ব বুঝে ১৫ থেকে ২৫ লাখ টাকায় ব্যবসায়ীদের মাঝে বিক্রির পাঁয়তারা শুরু হয়। আওয়ামী লীগ নেতাদের বেপরোয়া বাণিজ্যিক মনোভাব ব্যবসায়ীদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। এ সময় কিছু সচেতন মানুষ আইন লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে নির্মিত ভবন উচ্ছেদের দাবিতে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেন। এ নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ হলে জেলা পরিষদের তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজা রশীদ ২০২৪ সালের ১০ আগস্টের মধ্যে অবৈধ ভবন অপসারণের জন্য কথিত বন্দোবস্তপ্রাপ্তদের নির্দেশ দিয়ে চিঠি দেন। আগস্ট অভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতনের পর অবৈধ ভবনটি অপসারণের পরিবর্তে জেলা পরিষদের চরম বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান নতুন করে দোকানঘর বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু করেন। এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা প্রতিবাদ জানালে মাহবুবকে জেলা পরিষদ থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়।

এছাড়া চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর থেকে যতিন কাশেম সড়কের ৭৫টি দোকানঘর থেকে খাজনা আদায় বন্ধ ছিল। খুলনা জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব এসএম মনিরুল হাসান বাপ্পী জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ পাওয়ার পর নিজস্ব আয় বাড়াতে মনোযোগী হন। আওয়ামী লীগ অফিসের নিচে দুটি দোকানের একটি থেকে ৩০ বছরের বকেয়া ছয় লাখ টাকা খাজনা আদায় করেন। ইতঃপূর্বে ওই দুই দোকানের টাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের পকেটে যেত।

এদিকে দলীয় শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারের মাধ্যমে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে খুলনা জেলা বিএনপি সরদার বিল্লাল হোসেনকে বহিষ্কার করে। বিল্লাল হোসেন বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ডুমুরিয়া উপজেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি।

এ নিয়ে খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক এসএম মনিরুল হাসান বাপ্পী আমার দেশকে বলেন, মার্কেটগুলো বিগত সরকারের সময় তৈরি করা হয়। চব্বিশের আগস্টের পর তারা খাজনা বন্ধ রেখেছিল। আমি বকেয়া খাজনা আদায়ে উদ্যোগ নিয়েছি। মার্কেট নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। সেখানেই সব সমস্যার সুরাহা হবে। এ নিয়ে একটি পক্ষ অহেতুক বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছে। এখানে কোনো অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না; পাশাপাশি দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ হলে ছাড়ও দেওয়া হবে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন