মাঠ থেকে পেঁয়াজ তোলা শেষ। পেঁয়াজের ফলন ভালো হলেও চাষিরা এবার দাম পাচ্ছেন না। পাবনা-কুষ্টিয়ার যে পেঁয়াজগুলো সংরক্ষণ করা যাবে, তা ৩৫-৪০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। আর হালি পেঁয়াজের কেজি ২৫-৩০ টাকা।
পেঁয়াজচাষি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই পেঁয়াজের বাজার তেঁতে উঠবে। কোরবানি ঈদের আগে পেঁয়াজের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত সপ্তাহে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৩০ টাকা থাকলেও এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ টাকা। বর্তমানে হাট ও মোকামগুলোয় পর্যাপ্ত পেঁয়াজ আসছে না। ফলে গত দুই দিনে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিতে প্রায় পাঁচ টাকা। এ অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই দাম দ্বিগুণ হবে বলে জানিয়েছেন পেঁয়াজ উৎপাদনকারী কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
জানা গেছে, মাঠ থেকে পেঁয়াজ তোলার কদিন আগে পেঁয়াজসমৃদ্ধ কয়েকটি জেলা, বিশেষ করে পাবনা, ফরিদপুর, রংপুর ও নাটোর এলাকায় হালকা বৃষ্টিতে পেঁয়াজের কিছুটা ক্ষতি হয়। কৃষকের ভাষায়, এসব হালি পেঁয়াজ দাগি হওয়ায় মোকাম ও বাজারে ২৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। অপরদিকে সংরক্ষণ করা যাবে এমন পেঁয়াজের নাম হলো ‘মুড়িকাটা’। সেগুলো বাজারে আসছে না। মুড়িকাটা পেঁয়াজ শুকনো থাকায় ছয় মাস সংরক্ষণ করা যায়। কাজেই মোকামের ব্যবসায়ীরা বলছেন, হালি পেঁয়াজ শেষ হলেই আগামী ১০ দিনের মধ্যেই বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়বে এমনটাই জানিয়েছেন বগুড়ার পেঁয়াজ ব্যবসায়ী পরিমল প্রসাদ পোদ্দার।
সূত্র জানায়, দেশে চলতি বছর পেঁয়াজের চাহিদা ২৭-২৮ লাখ টন। চলতি মৌসুমে পেঁয়াজ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। বিশেষ করে হালকা বৃষ্টি হওয়ায় শুষ্ক মৌসুম থাকায় চাষিরা পেঁয়াজ ঘরে তুলতে পেরেছেন। দেশি পেঁয়াজের এখন ভরা মৌসুম হলেও হঠাৎ করেই আড়তে পেঁয়াজের সরবরাহ কমে গেছে। তাই পাইকারিতে দাম বাড়ার পথে। ঢাকায় সব থেকে বেশি পেঁয়াজ যায় ফরিদপুর থেকে। সেখানে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। আড়তদারদের কথা, সামনে দাম আরো বাড়বে।
দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনে শীর্ষে পাবনার সাঁথিয়া, ফরিদপুর, সুজানগর ও বেড়া; কুষ্টিয়ার মেহেরপুর, নাটোরের লালপুর, গুরুদাসপুর; রাজশাহীর দুর্গাপুর, পুঠিয়া, পবা, মোহনপুর, বাঘা, বাগমারা ও চারঘাট। এবার পাবনায় ৫৩ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে হালি (চারা) পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়েছে। সেখানে ৬ লাখ ৩৭ হাজার ৬৪০ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
পাবনার ফরিদপুর ও সাঁথিয়া উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। রাজশাহী কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনায় শীতকালীন মুড়িকাটা পেঁয়াজ এবং শীতকালীন হালি পেঁয়াজ প্রায় ১৫ লাখ টন উৎপাদন হয়। রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারীতে এ বছর ৯ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের চাষ হয়। সেখানেও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে। তবে এসব জেলার পেঁয়াজ এখনো বাজারে আসেনি। ফরিদপুর জেলায় এবার ১ হাজার ৮৫৪ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়। সেখানেও উৎপাদন বেড়েছে। কালো সোনা বা ‘ব্ল্যাক গোল্ড’ নামে পরিচিত পেঁয়াজবীজের উৎপাদন বেড়েছে। মেহেরপুর জেলায় সাড়ে ৫ হাজার হেক্টর জমিতে এবার পেঁয়াজের চাষ হয়। এ জেলায় মুড়িকাটা পেঁয়াজ উৎপাদন বেশি হয়।
গত মঙ্গলবার বগুড়ার পাইকারি ফাতেহ আলী ও রাজাবাজার এবং স্থানীয় বিভিন্ন বাজার ঘুরে জানা গেছে, বাজারভেদে হালি পেঁয়াজ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে পাইকারিতে ২৫-২৬ টাকা। আর খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা, যা দুই দিন আগেও ছিল ২২-২৫ টাকা কেজি। কিছু কিছু ব্যবসায়ী বাছাই করা ভালো পেঁয়াজ ৩৫-৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। এখন সেই পেঁয়াজের দাম বাড়তির দিকে।
এ ব্যাপারে বগুড়ায় পেঁয়াজের আড়তদার পরিমল প্রসাদ পোদ্দার, নাটোরের জিল্লুর, পাবনার খোকন ও আজিম আমার দেশকে বলেন, মোকাম বা হাটগুলো থেকে পেঁয়াজ আগের মতো আর আসছে না। পেঁয়াজ শুকনো হওয়ায় কৃষক মাচায় পেঁয়াজ সংরক্ষণ করছেন। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ সংরক্ষণ করছেন। সেজন্য মোকামগুলোতে পেঁয়াজ আসা কমে গেছে। এ অঞ্চলের মুড়িকাটা পেঁয়াজ আর বাজারে আসছে না। এখন আসছে হালি পেঁয়াজ। কিছু কিছু কাঁচা পেঁয়াজ বাজারে এলেও সেগুলোর দাম বাড়তির দিকে।
বগুড়ার রাজাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করা আমিরুল বলেন, কদিন আগে হালি পেঁয়াজ ২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছি। কিন্তু গত দুদিন ধরে পাইকারিতে পেঁয়াজের দাম দুই টাকা বেড়েছে। সেনাসদস্য (অব.) আমিরুল ইসলাম বলেন, পেঁয়াজের দাম নাকি আরো বাড়বে। এজন্য আপাতত সংরক্ষণ করছি। বড় বড় ব্যবসায়ীরাও এখন থেকেই মুড়িকাটা পেঁয়াজ কিনে মজুত করা শুরু করে দিয়েছেন। আবার অনেকে খাওয়ার জন্যও বেশি করে পেঁয়াজ কিনে রাখছেন। কারণ, এখন বাজারে খুব ভালো মানের শুকনো পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। এই পেঁয়াজ সহজে নষ্ট হবে না। আমার ধারণা, পেঁয়াজ বিক্রি বেড়ে যাওয়ার কারণেই এখন দাম বাড়ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

