রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বদলিতে টাকার খেলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আবেদন করেও বদলি হতে না পারা শিক্ষকদের অভিযোগ, বদলি নীতিমালা লঙ্ঘন করে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অন্য শিক্ষকদের বদলি করা হয়েছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২৫ জন শিক্ষককে গোদাগাড়ী উপজেলার ভেতরেই এক স্কুল থেকে অন্য স্কুলে বদলি করা হয়। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুনমুন সুলতানা বদলির আদেশে সই করেছেন। শিক্ষকদের বদলির জন্য গঠিত কমিটির সদস্যসচিব ছিলেন তিনি। আর কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত ২৪ সেপ্টেম্বর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আন্তঃউপজেলা বদলির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। আগ্রহী শিক্ষকদের ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদন করতে বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে বদলির জন্য প্রায় ১০৭ জন শিক্ষক আবেদন করেন। এদের মধ্য থেকে ২৫ জনের বদলি হয়েছে। এই বদলির ক্ষেত্রেই অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বদলি হওয়া শিক্ষকদের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের রেখে নবীনদের বদলি করা হয়েছে। নীতিমালায় বলা আছে, কোনো বিদ্যালয়ে পাঁচজনের কম শিক্ষক থাকলে কাউকে বদলি করা হবে না।
অথচ বদলির ক্ষেত্রে এই নীতিমালাও লঙ্ঘন করা হয়েছে। পদ্মা নদীর ওপারে ভারতীয় সীমান্ত লাগোয়া দিয়াড় মানিকচক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ছিলেন মাত্র পাঁচজন। অথচ স্কুলটির প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষক মমিনুল ইসলামকে বদলি করা হয়েছে। তিনি বদলি হয়েছেন সহড়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। অভিযোগ রয়েছে, টাকার বিনিময়ে বদলির সুযোগ পেয়েছেন মমিনুল ইসলাম।
যোগাযোগ করা হলে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি মমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, রোজ রোজ নদী পার হয়ে স্কুলে যাওয়া কষ্টের ছিল। এ জন্য বদলির আবেদন করেছিলাম। এখন এপারে সড়কের পাশের একটা স্কুলে আসতে পেরেছি। আমি যে স্কুলে এসেছি এখানেও কেউ আসে না। এ জন্য আমাকে বদলি করে দিয়েছে। এটা নিয়ে অসুবিধা হয়নি। তিনি জানান, এখন দিয়াড় মানিকচক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চারজন শিক্ষক থাকলেন।
এতে নীতিমালা লঙ্ঘন হলো কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আরেকটা নিয়ম আছে ৪০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন করে শিক্ষক থাকলেই হবে। এই ক্রাইটেরিয়া পূরণ করেছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দিয়াড় মানিকচক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থী আছে ১৭০ জন। প্রতিজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থীর রেশিও হচ্ছে ৪২ দশমিক ৫ জন। অর্থাৎ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর রেশিও মানা হয়নি মমিনুল ইসলামের বদলির ক্ষেত্রে। বদলির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা থাকলেও ২০১৩ সালে যোগ দেওয়া মাছমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাসিমা খাতুনকে বিজয়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে।
২০২৩ সালে যোগ দেওয়া চর হনুমন্তনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. আলিমুজ্জামানকে ঘিয়াপুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। ২০২৪ সালে নিয়োগ পাওয়া সরদল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মেরিনা খাতুনকে ঈদলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে।
আবেদন করেও বদলির সুযোগ না পাওয়া একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ১৯৯৯ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন এমন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকও বদলির আবেদন করেছিলেন। তাদের রেখে চাকরিতে নতুন যোগ দিয়েছেন এমন শিক্ষকদের বদলি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে অনৈতিক লেনদেন হয়েছে। আমরা বছরের পর বছর দূরের স্কুলে চাকরি করছি। এখন বয়স বেড়েছে। দূরে যেতে কষ্ট হয়। বাড়ির কাছাকাছি বদলি হতে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু বদলি করা হয়নি।
ক্ষুব্ধ আরেক শিক্ষক বলেন, এই বদলির ক্ষেত্রে ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। যারা টাকা দিয়েছেন তাদের বদলি হয়েছে। সবার কাছে তো টাকা চাইতে পারেনি। যারা টাকা দেয়নি তাদের বদলি হয়নি।
তিনি অভিযোগ করেন, গোদাগাড়ী পৌর আওয়ামী লীগের ক্রীড়া সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলাম দুলালের স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিনকেও বদলি করা হয়েছে টাকার বিনিময়ে। তিনি ছিলেন সহড়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তাকে গোদাগাড়ী পৌর এলাকার লালবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আনা হয়েছে। শিক্ষক নেতারা এই তদবিরে সমন্বয় করেছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
বদিলর ক্ষেত্রে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের বদলির জন্য গঠিত কমিটির সদস্য সচিব মুনমুন সুলতানা বলেন, বদলি তো আমি একা করিনি। একটা নির্দিষ্ট কমিটি আছে। আমি আমার কথা বলতে পারি, অন্যের কথা বলতে পারি না। আমি আমারটুকু ক্লিয়ার এটা বলতে পারি।
কথা বলতে বদলি কমিটির সভাপতি ও গোদাগাড়ীর ইউএনও ইসরাত জাহানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তাই এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

