বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কবি শেখ ফজলল করিম। ১৮৮২ সালের ১৪ এপ্রিল লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তারই স্মরণে ২০০৫ সালে উপজেলায় প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘কবি শেখ ফজলল করিম স্মৃতি গণপাঠাগার’। তবে কবির স্মৃতিবিজড়িত পাঠাগারটি প্রায় দুই দশক ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পাঠাগারটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে নতুন প্রজন্মের জ্ঞানচর্চার সুযোগ ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে, কাকিনায় কবির জন্মভিটায় থাকা স্মৃতিচিহ্নগুলোও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, পাঠাগারের ফটকের দুপাশে দোকানপাট বসানো হয়েছে। আশপাশে জমে আছে ময়লার স্তূপ। ভবনের দেয়ালের রঙ উঠে গেছে, মলিন হয়ে পড়েছে ঝুলন্ত সাইনবোর্ডও। ফলে কবির নামে প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রটি শিক্ষার্থী ও সাধারণ পাঠকদের ব্যবহারের বাইরে চলে গেছে।
শেখ ফজলল করিমের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির উঠানের এক পাশে তার কবর রয়েছে। টিনশেডের আধাপাকা বাড়ির একটি কক্ষে সংরক্ষণ করা হয়েছে তার ব্যবহৃত কাঠের খাট, আরামচেয়ার, টুপি, দোয়াত-কলম, ছোট আকৃতির কোরআন শরিফ, ম্যাগনিফায়িং গ্লাস, বোতামসহ বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন। পরিবারের সদস্যরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে এগুলো সংরক্ষণের চেষ্টা করলেও লোকবল ও আর্থিক সংকটের কারণে তা কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে সাহিত্যানুরাগীরা সেখানে এলেও তাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা বা নিয়মিত প্রদর্শনীর আয়োজন।
এ নিয়ে কবির নাতির ছেলে শেখ ফিরোজ বলেন, বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত থেকে অনেকে এই বাড়িতে আসেন। কিন্তু লোকবল ও আর্থিক সংকটে পরিবারের পক্ষে এসব স্মৃতি সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি সরকারের উদ্যোগে একটি জাদুঘর নির্মাণ করে কবির ব্যবহৃত সামগ্রী সংরক্ষণের দাবি জানান। একই সঙ্গে একসময় পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত থাকা ‘কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক’ কবিতাটি পুনরায় পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও জানান।
কাকিনার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী কবির হোসেন বলেন, কবির স্মৃতি এভাবে নষ্ট হতে দেখে তারা ব্যথিত। দ্রুত পাঠাগার চালু ও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
একই এলাকার কলেজ শিক্ষার্থী মাহমুদা আক্তার বলেন, তাদের বাড়ির পাশেই এমন একজন কবির জন্মভিটা থাকলেও অনেকে তার সম্পর্কে জানেন না। পাঠাগারটি কোনোদিন খোলা দেখেননি। এভাবে চলতে থাকলে আগামী প্রজন্ম কবি সম্পর্কে জানার সুযোগ হারাবে।
ঢাকা, বগুড়া ও কুমিল্লা থেকে আসা কয়েকজন দর্শনার্থী বলেন, দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবির স্মৃতি দেখতে এসে তারা অযত্নের চিত্র দেখেছেন। তাদের মতে, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে কবির ব্যবহৃত সামগ্রী সংরক্ষণ করা সম্ভব।
স্থানীয়রা জানান, কবির জন্ম ও মৃত্যুদিবসে মাঝেমধ্যে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলেও সারা বছর পাঠাগার পরিচালনা ও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে নিয়মিত উদ্যোগ দেখা যায় না।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা পাঠাগারটি দ্রুত চালুর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি কবির ব্যবহৃত দুর্লভ স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হবে।
কাকিনা স্কুল ও রংপুর জেলা স্কুলে কবির শিক্ষাজীবন শুরু হলেও তা দীর্ঘায়িত হয়নি। অল্প বয়স থেকেই সাহিত্যচর্চা ও সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন তিনি। গদ্য ও পদ্য মিলিয়ে তার প্রায় ৪৫টি গ্রন্থ রয়েছে। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘সাহিত্য বিশারদ’, ‘নীতিভূষণ’ ও ‘কাব্যরত্নাকর’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৩৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

