‘আজ রাতে কী খাব জানি না’—তিস্তার ভাঙনে নিঃস্ব মর্জিনার কান্না

‘আজ রাতে কী খাব জানি না’—তিস্তার ভাঙনে নিঃস্ব মর্জিনার কান্না

"আল্লাহ ছাড়া এখন আমাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। আজ রাতে কী খাব, সেটাও জানি না। এলাকার কেউ আমাদের আশ্রয় দিতে চাইছে না। নদী আমার সোনার বাড়িঘর সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। এখন আমার ছোট ছোট সন্তানগুলো কী খেয়ে বাঁচবে? আমাদের সুন্দর সাজানো সংসার মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেল। এখন আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ভরসা নেই।'' কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন নদী-ভাঙনে সর্বস্ব হারানো মোত্তালেব হোসেনের স্ত্রী মর্জিনা বেগম।

বিজ্ঞাপন

উজানের পাহাড়ি ঢল ও ভারি বৃষ্টিতে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার রংপুরের গঙ্গাচড়ায় উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের চর নোহালী কাচারি পাড়া এলাকায় নদীভাঙনে মোত্তালেব হোসেন ও আবু তালেবের বসতবাড়ি নদীগর্ভে চলে যায় শুধু আছে সামান্য একটু জায়গা। মঙ্গলবার সেখানেই কথা হয় মর্জিনা বেগমের সাথে।

কান্না জনিত কষ্টে তিনি বলেন,"বাড়ি নদীতে বিলীন হওয়ার চার-পাঁচ দিন হয়ে গেছে। ঘরে কোনো খাবার নেই। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হচ্ছে। মানুষের বাড়িতে কাজ করে, কাশ (ঘাস) কেটে কষ্ট করে টাকা জোগাড় করে সংসারটা গুছিয়েছিলাম। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেই গুছানো সংসার নদীর ভাঙনে চুরমার হয়ে গেল। এখন আমরা অসহায় হয়ে দিন কাটাচ্ছি।"

নদীর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কান্না করছেন মোত্তালেব হোসেন। নিমিষেই তার বাড়িটি নদীতে কিভাবে চলে গেল এই চিন্তাই করছেন তিনি। তিনি বলেন, নদীতে আমার সব কিছু চলে গেল। আমি এখন কি করবো? আমিও অসহায় হয়ে গেলাম। কান্না করা ছাড়া আর আমার কোন উপায় নেই। সরকার যদি একটু সাহায্য করে তাহলে বউ বাচ্চা নিও বাকি জীবন টুকু বাঁচতে পারব। আর যদি সাহায্য না করে তাহলে যেকোনো সময় নদীতে ভাসি যাব। আমার সোনার সংসার বাড়িঘর জমি জমা নিমিষেই নদীতে চলি গেল।

তিন বলেন, ২০০৮ সালে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনি পাকা বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন। দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও কষ্টার্জিত অর্থে গড়ে তোলা বাড়িটি এ বছরে তিস্তার হটাৎ পানি বৃদ্ধি ও তীব্র ভাঙনের কারণে মুহূর্তেই নদীগর্ভে তলিয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, সরকার যদি ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ (বালুর বস্তা) বা কংক্রিট ব্লক ফেলা হলে নদীভাঙন অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

নদীর পেটে চলে গেছে বাড়িটি আছে কয়েকটি ইট। সেগুলো সংগ্রহ করছে সুরুজ ইসলাম। তিনি বলেন, নদীতে বাড়ি ভাঙ্গে গেছে এখন যে কয়েকটা সম্পদ আছে সেগুলো সংগ্রহ করছি। সেগুলো নিয়ে অন্য জায়গায় মাথা গোছার ঠাই করার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, নদীর ভাঙ্গন স্থানে জিও ব্যাগ দেওয়া হলে এই ভাঙ্গন গুলো হবে না।

৩৫ বছর থেকে নদী পারে যুদ্ধ করে বসবাস করে আসছেন আবু তালেব। ৪-৫ বার বাড়ির স্থান পরিবর্তন করে পাকা বাড়ি বানিয়েছেন। তবে সেটি শেষ রক্ষা করতে পারলের না তিনি।

তিনি বলেন, ইতিমধ্যে কয়েকটা বাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখনো যদি এইস্থানে বাঁধের ব্যবস্থা করে তাহলে চার-পাঁচশো বাড়িঘর রক্ষা পাবে। ব্লক, বালুর বস্তা যদি নদী ভাঙ্গল এলাকাগুলোতে দ্রুতনদেয় তাহলে বাকি আর কোন ক্ষয়ক্ষতি হবে না।

গংগাচাড়া উপজেলার লোহানি ইউনিয়নের চর বাগডোহার গ্রামের বাসিন্দা সবুজ মিয়া বলেন, প্রতিবছর বন্যা মৌসুমে তিস্তার ভাঙ্গন শুরু হয়। এবছরও নদীর তীব্র ভাঙ্গনে বসত বিটা ও আবাদী জমি হুমকির মুখে পড়েছে। ভাঙ্গন ঠেকাতে নদীর তীরে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চললেও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ইতিমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। জনদুর্ভুকে পড়েছে স্থানীয়রা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভাঙন-প্রবণ স্থানগুলোতে জিও ব্যাগ ফেলে নদীতীর রক্ষার কাজ চলমান রয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ৫১.৯৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহ হচ্ছে।

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সোমবার ৬৬ দশমিক ৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিনদিন চলমান বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।  দেশের অনেক জায়গায় ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।

এছাড়াও লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারি, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, কুড়িগ্রামের চিলমারী, রাজারহাট, উলিপুর, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, নীলফামারীর জলঢাকাসহ নিম্ন অঞ্চল ও চর অঞ্চলের বাসা বাড়িতে উঠেছে পানি। এছাড়াও তীব্র স্রোতে গঙ্গাচড়ার তিস্তা সেতু রক্ষা বাধে ব্যাপক ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন