যুগ যুগ ধরে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত হয়ে একই আঙিনায় দাঁড়িয়ে আছে মন্দির ও মসজিদ। সম্প্রীতির এ দৃষ্টান্ত রয়েছে লালমনিরহাট শহরের কালীবাড়ী এলাকায়। আলাদা ধর্মের মানুষের আলাদা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দুটির অবস্থান মাত্র ছয় ফুট ব্যবধানে। মন্দিরটির নাম কেন্দ্রীয় কালীবাড়ী শ্রীশ্রী দুর্গা ও কালীমন্দির আর মসজিদটির নাম পুরান বাজার জামে মসজিদ। একই সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মন্দিরে পুজার্চনা করেন আর মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ মসজিদে নামাজ আদায় করেন।
মসজিদে নামাজ আদায়ের সময় মন্দিরে বন্ধ রাখা হয় বাদ্যযন্ত্র বাজানো। এক পাশে উলুধ্বনি, অন্য পাশে চলছে আল্লাহ তাআলার জিকির।
এভাবে ধর্মীয় সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যুগ যুগ ধরে চলছে পৃথক দুটি ধর্মীয় উপাসনালয়। এক পাশে ধূপকাঠি, অন্য পাশে আতরের সুঘ্রাণ। একই আঙিনায় মন্দির-মসজিদে পৃথক ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মচর্চা করে আসছেন কিন্তু কখনো কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়নি কোনো বিবাদ। স্থানীয় বাসিন্দা, মসজিদ ও মন্দিরসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শহরের পুরান বাজারে ১৮৩৬ সালে প্রথম কালীমন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯১৫ সালের দিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ নামাজ পড়ার জন্য মন্দিরের পাশে একই আঙিনায় একটি ওয়াক্তিয়া মসজিদ তৈরি করেন। পরে সেটি জুমা মসজিদে রূপান্তরিত হয়, যেটি পুরান বাজার জামে মসজিদ নামে পরিচিত। এ ছাড়া বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কালীমন্দিরের পাশে দুর্গামন্দির স্থাপিত হয়।
এই সম্প্রীতির নির্দশন মন্দির ও মসজিদ দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসে সাধারণ মানুষ। কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতও এই মন্দির ও মসজিদ পরিদর্শনে এসেছিলেন।
একই সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মন্দিরে পূজার্চনা করেন আর মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ মসজিদে নামাজ আদায় করেন। মসজিদে নামাজ আদায়ের সময় মন্দিরে বন্ধ রাখা হয় বাদ্যযন্ত্র বাজানো। যুগ যুগ ধরে একই আঙিনায় মন্দির-মসজিদে পৃথক ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মচর্চা করে আসছেন, কিন্তু কখনো কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। মুসলিম ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়নি কোনো বিবাদ।
পুরান ঢাকা থেকে আসা দর্শনার্থী আরিফ সাবেরী (৫৫), মনোয়ার হোসেন, (৪৫) ও কমল চন্দ্র রায় (৪৮)বলেন, তারা একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দিরের কথা শুনে তা দেখতে আসেন। এটি দেখে তারা সবাই মুগ্ধ হয়েছেন। কয়েক যুগ ধরে একই আঙিনায় দুটি পৃথক ধর্মের পৃথক দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, কিন্তু কোনো দিনই কোনো ধর্মের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির ঘাটতি হয়নি। এটি সত্যি বাংলাদেশের ইতিহাসে বিড়ল ঘটনা ।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, আজানের সময় থেকে নামাজের জামাত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মন্দিরের ঢাকঢোলসহ যাবতীয় শব্দযন্ত্র বন্ধ থাকে। নামাজ শেষ হলে মন্দিরের কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়। এখানে কোনো বিশৃঙ্খলাও হয় না। শালীনতা বজায় রেখে একই উঠানে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় উৎসব পালন করে আসছেন উভয় ধর্মের মানুষ।
নামাজ শেষ করে উঠানে পা রাখতেই চোখে পড়বে মন্দিরের দেবী দুর্গার প্রতিমা। একইভাবে পূজারিরাও পূজা করতে এসে মুসলমানদের নামাজের দৃশ্য অবলোকন করতে পারছেন।
পূজারি দিলীপ চন্দ্র রায় বলেন, ‘লালমনিরহাটে ধর্মীয় সম্প্রীতির এটি একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই যুগ যুগ ধরে এই সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ধর্মীয় উৎসব পালন করছি আমরা। সত্যি এটি আমাদের জন্য অনেক বড় গর্বের বিষয়।’
কালীবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আমিরুল হায়াত মুকুল জানান, এই মন্দির ১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এলাকার নামকরণও করা হয় কালীবাড়ী। সেই থেকে এক উঠানে চলছে দুই ধর্মের দুই উপাসনালয়ের কার্যক্রম। এখানে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি কখনো।
কালীবাড়ী মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম দুলাল বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে মন্দিরে নির্বিঘ্নে ধর্মচর্চা করতে আমরা সব সময়ই সহযোগিতা দিয়ে থাকি। একই আঙিনায় মন্দির-মসজিদ শুধু লালমনিরহাটের জন্য ধর্মীয় সম্প্রীতির উদাহরণ নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের জন্য ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মসজিদ ও মন্দির কমিটির লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একই আঙিনায় মন্দির-মসজিদ থাকলেও আঙিনাটির মালিক অন্যজন। মন্দিরটি রয়েছে আট শতাংশ জমিতে আর মসজিদটি রয়েছে পাঁচ শতাংশ জমিতে। আঙিনার জমির পরিমাণ ১২ শতাংশ।
পুরান বাজার জামে মসজিদের ইমাম আলাউদ্দিন আল আজাদ বলেন, ঐতিহ্যবাহী পুরান বাজারে একসঙ্গে দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। মসজিদের আগে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবুও এখানে জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ স্বাধীনভাবে ঘুরতে আসে। আমরা তাদের সব কাজে সহযোগিতা করি। তারাও আমাদের সহযোগিতা করেন। নামাজের সময় মন্দিরের ঢাকঢোল বন্ধ রাখা হয়। কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই যুগ যুগ ধরে চলছে এই সম্প্রীতির বন্ধন।
এদিকে লালমনিরহাটে এবার ৪৭৬টি পূজামণ্ডপে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে। আগামী ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনব্যাপী এই উৎসব।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি হীরালাল রায় জানান, পূজামণ্ডপের উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার জন্য জেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিল থেকে প্রতিটি মণ্ডপে ৬০০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ৪৭৬টি মণ্ডপের জন্য মোট ২ লাখ ৮৫ হাজার ৬০০ কেজি চাল বরাদ্দ হয়েছে।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, জেলার পাঁচ উপজেলায় মোট ৪৭৬টি মণ্ডপের মধ্যে লালমনিরহাট সদরে ১৬২টি, আদিতমারীতে ১১৭টি, কালীগঞ্জে ৯৩টি, হাতীবান্ধায় ৭৩টি এবং পাটগ্রামে ৩১টি মণ্ডপ রয়েছে।
জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, প্রতিমা স্থাপন, সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও অন্যান্য প্রস্তুতির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। জেলা সদরের শ্রী গৌরিশংকর গোশালা সোসাইটি দুর্গামন্দির, কালীবাড়ী সর্বজনীন দুর্গামন্দির ও কাচারীবাড়ি সর্বজনীন দুর্গামন্দিরে উৎসবের প্রস্তুতি চলছে।
একইভাবে আদিতমারীর মহিষখোঁচা ইউনিয়নের কামারপাড়া দুর্গামন্দির, কালীগঞ্জের তুষভাণ্ডার রাজবাড়ী সর্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গামন্দির, হাতীবান্ধা কেন্দ্রীয় শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দ মন্দির ও সর্বজনীন দুর্গামণ্ডপ এবং পাটগ্রামের শ্রীশ্রী পাটেশ্বরী কেন্দ্রীয় দুর্গামন্দিরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের মণ্ডপেও চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
জেলা সদরের বড়বাড়ী বাজার শিবকালী ও দুর্গামন্দিরের সভাপতি নিমাই চন্দ্র পাল বলেন, প্রশাসনের সহযোগিতায় নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের সভাপতি বাবু গুরুচরণ রায় সাংবাদিকদের বলেন, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত সহযোগিতায় এবারও উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে বলে তারা আশাবাদী।
পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, জেলার পূজামণ্ডপগুলোতে বিশেষ নজরদারি থাকবে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে।
জেলা প্রশাসক মুহা. রাশেদুল হক প্রধান সাংবাদিকদের বলেন, দুর্গাপূজা উপলক্ষে জেলার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

